বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩, ২২ সফর ১৪৪৮

দেশের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আগামী ১৬ আগস্ট করা হবে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হওয়ার পর সরকার এখন জাতীয় পর্যায়ে এই কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। সরকার বলছে, একটি গতিশীল সামাজিক নিবন্ধন (ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে স্বচ্ছতার সঙ্গে সহায়তা দেওয়া হবে।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফাবাদ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনের পর পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলা ও ইউনিয়নে কর্মসূচির সম্প্রসারণ শুরু হবে। সরকারের লক্ষ্য, অক্টোবরের শেষ নাগাদ দেশের প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে কার্যক্রম চালু করা।

বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ফ্যামিলি কার্ডসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমানে পরিকল্পনায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও বাড়ানো হতে পারে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী জানান, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি গতিশীল তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ কোনো পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হলে সেই তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। কেউ দরিদ্র অবস্থা থেকে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তে উন্নীত হলে কিংবা আবার আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়লে সেটিও নিবন্ধনে যুক্ত হবে। এর ফলে প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধাভোগীর তালিকা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রকৃত সুবিধাভোগী বাদ পড়া বা অযোগ্য ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অভিযোগ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এসব দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো ভাতা ও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী আরও বলেন, এই কর্মসূচিতে ধর্ম, গোত্র, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সুবিধা দেওয়া বা বঞ্চিত করার সুযোগ থাকবে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের নীতির আলোকে সবাইকে সমানভাবে বিবেচনা করে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিবারের নারী সদস্যদের হাতেই সহায়তার অর্থ পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সমাজকল্যাণমন্ত্রীর ভাষ্য, নারীদের হাতে অর্থ পৌঁছালে তা শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, হাঁস-মুরগি পালন, গাছ লাগানো, কুটির শিল্প, সেলাই এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমে বেশি কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে একদিকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়বে, অন্যদিকে গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে দেশের ৫৬টি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে যশোর ও নেত্রকোনার দুটি এলাকায় তথ্য সংগ্রহে কিছু সমস্যা দেখা গেলেও তা দ্রুত সংশোধন করা হয়েছে। বাকি ৫৪টি এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনো জটিলতা পাওয়া যায়নি এবং সামগ্রিক ত্রুটির হার ৩ শতাংশেরও কম ছিল। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এখন জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, ১৬ আগস্ট থেকেই নতুন প্রশ্নমালা এবং সম্পূর্ণ অনলাইন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ শুরু হবে। এরপর প্রতি মাসে তথ্য হালনাগাদ করা হবে। কোনো পরিবারের সদস্যের মৃত্যু, আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো তথ্য পরিবর্তন হলে তা দ্রুত নিবন্ধনে যুক্ত করা হবে। এর ফলে তথ্যভান্ডার সবসময় হালনাগাদ থাকবে এবং ভুল তথ্যের কারণে কেউ অযথা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ পাবে না।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তারা তথ্য সংগ্রহের কাজ তদারকি করবেন। উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে পৃথক কমিটি থাকবে। জেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন জেলা প্রশাসক এবং বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি কাজ করবে। জাতীয় পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্ব দেবেন অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নিজেও নিয়মিতভাবে কর্মসূচির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী আরও জানান, একই ব্যক্তি যাতে একাধিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা নিতে না পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয় তথ্য যাচাই করবে। এছাড়া অর্থ বিভাগ, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে স্বাধীন মূল্যায়নের ব্যবস্থাও রাখা হবে। এসব মূল্যায়নের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দারিদ্র্য কমাতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে।

সরকারের আশা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভাতা ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা কমিয়ে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version