টানা চার কার্যদিবস দরপতনের পর মঙ্গলবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার বেড়েছে। দিনের শুরুতে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের ওপরে উঠলেও পরে কিছুটা নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও বেড়েছে। বাজারের নজর এখন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগের দিকে।
মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৫৮ মিনিট জিএমটিতে নভেম্বর সরবরাহের ব্রেন্ট ক্রুড ১ দশমিক ২৯ ডলার বা ১ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৩ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। একই সময়ে মঙ্গলবার মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ডব্লিউটিআইয়ের অক্টোবর চুক্তির দাম ৯২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ বেড়ে ৯৬ দশমিক ৭০ ডলারে ওঠে। তবে দিনের মধ্যে দাম আবার ওঠানামা করেছে।
এর আগে টানা চার কার্যদিবস তেলের দাম কমেছিল। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম নেমে এসেছিল ব্যারেলপ্রতি ১০০ দশমিক ৩৪ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ৯৫ দশমিক ৭৮ ডলারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বাড়ার ইঙ্গিত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সরবরাহসংকট নিয়ে বাজারের উদ্বেগ কিছুটা কমেছিল।
এই মুহূর্তে তেলের বাজারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে ইরানি প্রতিনিধিদল নিউইয়র্কে অবস্থান করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনা নাকচ করেননি। সম্ভাব্য কূটনৈতিক অগ্রগতির দিকে তাই নজর রাখছেন জ্বালানি বাজারের বিনিয়োগকারীরা।
এর আগে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই আল-জাজিরাকে জানান, কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আলোচনায় ফেরার কয়েকটি শর্ত পাঠিয়েছে তেহরান। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় এবং দেশটির ওপর নৌ অবরোধের অবসান।
মঙ্গলবার নতুন করে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনাও সামনে এসেছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ শিথিল করার পদক্ষেপ নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে প্রস্তুত তেহরান। এই খবর প্রকাশের পর দিনের পরবর্তী সময়ে তেলের দাম আবার কমে যায়। ব্রেন্ট একপর্যায়ে ৯৯ দশমিক ৪৫ ডলার এবং ডব্লিউটিআই অক্টোবর চুক্তি ৯৪ দশমিক ৬৯ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ মঙ্গলবারের বাজারে শুরুতে দাম বাড়লেও পরে পরিস্থিতি বদলেছে।
তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হামলার কারণে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে কিছু চালান বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর সৌদি আরামকো উপসাগরীয় টার্মিনাল থেকে রপ্তানি বাড়িয়েছে। রোববার বড় তেলবাহী জাহাজগুলোতে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল লোড করা হয়। বাড়তি এই সরবরাহ বিশ্ববাজারে তাৎক্ষণিক ঘাটতির আশঙ্কা কিছুটা কমিয়েছে।
অন্যদিকে নতুন সরবরাহঝুঁকিও তৈরি হয়েছে লিবিয়ায়। দেশটির ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন জানিয়েছে, একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী শরারা তেলক্ষেত্র থেকে জাওইয়া বন্দরে তেল নেওয়ার পাইপলাইনের ৭ নম্বর ভাল্ভ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেলক্ষেত্রের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, উৎপাদন দিনে প্রায় দুই লাখ ব্যারেল কমেছে।
সব মিলিয়ে বিশ্ববাজার এখন বিপরীতমুখী কয়েকটি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। একদিকে হরমুজ দিয়ে সরবরাহ বাড়া এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা দাম কমানোর চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা ও লিবিয়ার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো ঘটনা সরবরাহঝুঁকি ধরে রেখেছে। ফলে কূটনৈতিক পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।
বাংলাদেশের হিসাবে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলার ধরে এক ব্যারেল বা প্রায় ১৫৯ লিটার অপরিশোধিত তেলের শুধু আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রতি লিটারে প্রায় ৬৪ সেন্ট। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে এর মূল্য প্রায় ৭৯ টাকা। তবে এটিকে দেশের পেট্রল, ডিজেল বা অকটেনের খুচরা দামের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যাবে না। কারণ আমদানি করা জ্বালানির সঙ্গে পরিবহন, বিমা, পরিশোধন, সংরক্ষণ, বিতরণসহ বিভিন্ন ব্যয় ও প্রযোজ্য শুল্ক-কর যুক্ত হয়।


