গাজীপুরের কোনাবাড়ী। ২০২৩ সালের ৮ নভেম্বর। ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা করার দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন হাজারো পোশাকশ্রমিক। হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, ছিল শুধু বাঁচার মতো মজুরির দাবি। কিন্তু সেই দাবির জবাব এসেছিল গুলিতে। আর কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রাণ হারান চারজন শ্রমিক।
প্রেক্ষাপটটা বোঝা জরুরি। দেশের পোশাক খাতে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, যাদের বড় অংশই নারী। ২০১৮ সালে তাদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র ৮ হাজার টাকা। এরপর পাঁচ বছরে চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে ঘরভাড়া, সবকিছুর দাম বেড়েছে কয়েক গুণ। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি থেকে গেছে আগের জায়গাতেই। সেই চাপ থেকেই ২৩ হাজার টাকার দাবি নিয়ে মাঠে নামেন তারা।
ঘটনার শুরু অক্টোবরের শেষ দিকে। মালিকপক্ষ মজুরি বোর্ডে প্রস্তাব দেয় মাত্র ১০ হাজার ৪০০ টাকা। শ্রমিকরা তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনে নামেন। ৩০ অক্টোবর গাজীপুরে ডিজাইন এক্সপ্রেস কারখানার ইলেকট্রিশিয়ান রাসেল হাওলাদার গুলিবিদ্ধ হন। বয়স মাত্র পঁচিশ-ছাব্বিশ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, খুব কাছ থেকে পুলিশ তাকে গুলি করে। যদিও পুলিশ তখন দাবি করেছিল, কার গুলিতে রাসেল মারা গেছেন, তা তারা জানে না।
একই দিনে বিক্ষোভের মধ্যে আগুন দেওয়া এবিএম ফ্যাশনস কারখানার ভেতরে গুরুতর আহত হয়ে মারা যান শ্রমিক ইমরান হোসেন। বয়স ছিল বত্রিশ। এই মৃত্যুর দায়ও আজ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি।
এদিকে আন্দোলন থামেনি। ৭ নভেম্বর মজুরি বোর্ড ঘোষণা করে সাড়ে ১২ হাজার টাকা। শ্রমিকরা বলেন, বাজারদরের তুলনায় এটি কিছুই নয়। পরদিন কোনাবাড়ীতে বিক্ষোভের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন ইসলাম গার্মেন্টসের সেলাই মেশিন অপারেটর আঞ্জুয়ারা খাতুন। বয়স মাত্র চব্বিশ। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন ওই কারখানার সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন। কয়েক দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। সেদিন আহত হন আরও অনেক শ্রমিক। জালাল উদ্দিনের স্ত্রীর প্রশ্ন ছিল একটাই, তবু কেন গুলি?
তবে প্রশ্ন শুধু গুলি নিয়েই নয়। প্রশ্ন উঠেছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকা নিয়েও। আন্দোলনের মধ্যেই দলের এক বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যে মজুরি বাড়ানো হয়েছে, তা নিয়েই শ্রমিকদের কাজ করতে হবে। রাস্তায় নামলে চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে যেতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্য শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কার্যত হুমকির মুখে ঠেলে দেয়।
এছাড়াও আন্দোলনের পর শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। শ্রমিক নেতাদের দাবি, গাজীপুর, মিরপুর ও সাভারে ৬২টি মামলায় প্রায় ২৩ হাজার শ্রমিককে আসামি করা হয়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, নিহত শ্রমিকদের হত্যার বিচারের চেয়ে আন্দোলনকারীদের দমনেই বেশি তৎপর ছিল তৎকালীন প্রশাসন।
রাসেল, ইমরান, আঞ্জুয়ারা, জালাল। চারটি নাম, চারটি পরিবার, ঝরে যাওয়া চারটি স্বপ্ন। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এই পরিবারগুলোর প্রশ্নের জবাব মেলেনি। যে শ্রমিকদের ঘামে দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে, তাদের প্রাণের দাম কি এতটাই সস্তা? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই চার হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচার না হলে শ্রমিকের ন্যায্য দাবির লড়াই বারবার রক্তেই থমকে যাবে।



