সুস্থ শরীর বজায় রাখা থেকে শুরু করে পেশি তৈরি কিংবা দৈনন্দিন কাজের শক্তি ধরে রাখা—সব ক্ষেত্রেই প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। আর উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম ও চিকেন দুটিই বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে নিয়মিত ব্যায়াম বা জিম করেন এমন অনেকের প্রশ্ন, প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ডিম বেশি খাবেন, নাকি খাদ্যতালিকায় চিকেনের পরিমাণ বাড়াবেন?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর উত্তর একেবারে সাদাকালো নয়। বেশি পরিমাণ প্রোটিন পেতে চাইলে চিকেন এগিয়ে। অন্যদিকে প্রোটিনের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজ পেতে ডিমের আলাদা সুবিধা রয়েছে। ফলে কোনটি বেশি উপকারী হবে, তা নির্ভর করবে ব্যক্তির পুষ্টির চাহিদা, খাদ্যাভ্যাস ও বাজেটের ওপর।
প্রোটিনের পরিমাণের হিসাবে চিকেনের সুবিধা স্পষ্ট। প্রতি ১০০ গ্রাম রান্না করা চিকেন ব্রেস্টে প্রায় ৩০ গ্রাম বা তার বেশি প্রোটিন পাওয়া যেতে পারে। বিপরীতে একটি মাঝারি আকারের ডিমে সাধারণত প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে।
তাই যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, পেশি তৈরি করতে চান কিংবা দৈনিক তুলনামূলক বেশি প্রোটিন প্রয়োজন, তাঁদের জন্য চিকেন খাদ্যতালিকায় রাখা সুবিধাজনক হতে পারে। বিশেষ করে চামড়াহীন চিকেন ব্রেস্ট তুলনামূলক কম ফ্যাটে বেশি প্রোটিন সরবরাহ করে।
তবে শুধু প্রোটিনের পরিমাণ দিয়েই ডিমকে পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই। ডিমের প্রোটিন উচ্চমানের প্রোটিন হিসেবে পরিচিত। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অ্যামিনো অ্যাসিড রয়েছে এবং শরীর এই প্রোটিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।
তবে ডিমের ‘বায়োলজিক্যাল ভ্যালু’ ১০০ এবং চিকেনের ৭৯—এমন সংখ্যার ভিত্তিতে সরাসরি বলা ঠিক নয় যে ডিমের প্রোটিন শরীর অনেক বেশি শোষণ করে। কোনো প্রোটিনের মান নির্ধারণে অ্যামিনো অ্যাসিডের গঠন, হজমযোগ্যতা এবং শরীরের প্রয়োজনসহ একাধিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ডিমের বড় সুবিধা হলো, এটি শুধু প্রোটিনের উৎস নয়। বিশেষ করে ডিমের কুসুমে ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, কোলিন, সেলেনিয়াম ও লুটেইনের মতো বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ফলে তুলনামূলক ছোট একটি খাবারের মধ্যেই বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি পাওয়া যায়।
অন্যদিকে কুসুমে ফ্যাট ও কোলেস্টেরলও থাকে। তাই যাঁদের নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত কারণে খাবারের কোলেস্টেরল বা ফ্যাট নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তাঁদের ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা অনুযায়ী ডিমের পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
চিকেনেও শুধু প্রোটিন নয়, আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। চামড়াহীন চিকেন ব্রেস্টে ভিটামিন বি৬, নিয়াসিন, ফসফরাস ও জিঙ্ক পাওয়া যায়। কম ফ্যাটের সঙ্গে বেশি প্রোটিন পাওয়ার সুবিধার কারণে জিম করেন এমন মানুষের খাদ্যতালিকায় এটি বেশ জনপ্রিয়।
ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও দুটির মধ্যে একটিকে সরাসরি বিজয়ী ঘোষণা করা কঠিন। চামড়াহীন চিকেন ব্রেস্ট কম ফ্যাটে তুলনামূলক বেশি প্রোটিন দিতে পারে। ফলে মোট ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেশি প্রোটিন প্রয়োজন হলে এটি সুবিধাজনক।
আবার পরিমাণমতো ডিমও সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দ্রুত তৈরি করা যায় এমন খাবার হিসেবে ডিমের ব্যবহার সহজ। তাই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রোটিন যোগ করার সুবিধাজনক একটি উপায় হতে পারে এটি।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় পুষ্টির পাশাপাশি খাবারের দামও গুরুত্বপূর্ণ। ডিম সাধারণত সহজলভ্য, রান্না সহজ এবং অল্প পরিমাণেও দৈনন্দিন খাবারের সঙ্গে যোগ করা যায়। চিকেনের জন্য তুলনামূলক বেশি খরচ হতে পারে, তবে একই পরিমাণ খাবার থেকে বেশি প্রোটিন পাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
ফলে পেশি তৈরির জন্য বেশি প্রোটিন প্রয়োজন হলে চিকেন এগিয়ে থাকতে পারে। বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টসহ পুষ্টিকর খাবার চাইলে ডিম ভালো বিকল্প। আবার কম ফ্যাটে বেশি প্রোটিনের লক্ষ্য থাকলে চামড়াহীন চিকেন ব্রেস্ট সুবিধাজনক।
তবে ডিম ও চিকেনের মধ্যে একটিকে বেছে নিয়ে অন্যটিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা, মোট ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম এবং বাজেট বিবেচনায় দুটিই সুষম খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত পেশি তৈরি কিংবা সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে শুধু ‘ডিম নাকি চিকেন’—এই একটি সিদ্ধান্তই মুখ্য নয়। বরং সারাদিনে মোট কতটা প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি গ্রহণ করা হচ্ছে এবং পুরো খাদ্যতালিকা কতটা সুষম—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



