সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

নেপালের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে অসংখ্য মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে ছুটছিলেন, ঠিক তখনই অসাধারণ সাহস ও উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেন ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবি। পাহাড়ি ঢল স্কুলে আঘাত হানার আগমুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন শিক্ষার্থীদের। শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায় ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর প্রাণ।

ঘটনাটি ২৬ আগস্ট বুধবার সকালের। ঘড়িতে তখন প্রায় ৯টা ২০ মিনিট। প্রতিদিনের মতো বিদ্যালয়ে ক্লাস চলছিল। স্কুলে ইতিমধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী। আরও প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী তখন হেঁটে কিংবা স্কুলবাসে করে বিদ্যালয়ের দিকে আসছিল।

সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। হঠাৎ প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবির কাছে আসে বিপদের প্রথম বার্তা।

স্কুল থেকে প্রায় সাত থেকে আট কিলোমিটার উজানে বেত্রাবতী গ্রামের এক বন্ধু তাঁকে ফোন করেন। তিনি জানান, তাঁদের গ্রাম প্রবল পানির তোড়ে ভেসে গেছে এবং ভয়াবহ ঢল দ্রুত স্কুল এলাকার দিকে এগিয়ে আসছে।

একই সময়ে স্কুল এলাকার এক অভিভাবকও এসে সতর্ক করেন, আশপাশে দ্রুত পানি বাড়ছে।

দুটি সতর্কবার্তা পাওয়ার পর পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে দেরি করেননি রাজেন্দ্র দাদাবি। আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত শিক্ষকদের নির্দেশ দেন স্কুলের ঘণ্টা বাজাতে। শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে যত দ্রুত সম্ভব উঁচু ও নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কিন্তু বিদ্যালয়ের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নিলেই বিপদ শেষ হচ্ছিল না। স্কুলের পথে তখনও ছিল আরও কয়েক শ শিক্ষার্থী। তাদের একটি অংশ কয়েকটি স্কুলবাসে করে বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে আসছিল।

প্রধান শিক্ষক দ্রুত বাসচালকদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। চালকদের নির্দেশ দেওয়া হয়, কোনো অবস্থাতেই যেন তাঁরা স্কুলের দিকে না আসেন। যেখানে নিরাপদ উঁচু জায়গা পাওয়া যাবে, সেখানেই বাস থামিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে রাখতে বলা হয়।

তবে একটি বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিল না স্কুল কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, সেই বাসটি স্কুলের কাছের একটি সেতু পার হওয়ার চেষ্টা করছে।

ততক্ষণে চারদিকে পানি ছড়িয়ে পড়েছে। স্কুলের মাঠেও প্রবল স্রোত ঢুকতে শুরু করেছে। প্রধান শিক্ষক বাসচালককে দ্রুত ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু বাসটি তখন সেতুর মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে।

শেষ পর্যন্ত বাসটি নিরাপদে সেতুর অপর পাশে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। এর কিছুক্ষণ পরই প্রবল পানির তোড়ে সেই সেতু ধসে পড়ে।

অন্যদিকে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠছিল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। পানি স্কুল ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে। প্রবল স্রোতের সামনে একে একে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভেসে যেতে থাকে স্থাপনাগুলো।

ততক্ষণে প্রধান শিক্ষক ও অন্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। আতঙ্কের মধ্যেও শিশুদের শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে উঁচু স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত হেঁটে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছাতে সক্ষম হয় শিক্ষার্থীরা।

যে স্কুলে কিছুক্ষণ আগেও ক্লাস চলছিল, বন্যার পর সেখানে আর আগের সেই পরিচিত দৃশ্য ছিল না। শ্রেণিকক্ষ ও মাঠসহ বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ভয়াবহ ঢলের কবলে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বেঁচে যায় ১ হাজার ৬৪৩ শিক্ষার্থীর প্রাণ।

ঘটনার বিবরণ তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস। প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবির দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষক-কর্মীদের ভূমিকার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

তবে ৪৭ বছর বয়সী রাজেন্দ্র দাদাবি নিজের ভূমিকা নিয়ে কোনো বীরত্বের দাবি করতে চাননি। তাঁর কাছে সেই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই ছিল দায়িত্ব।

একদিকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে শত শত শিশুর জীবন—সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য হাতে ছিল খুবই অল্প সময়। সেই সংকটময় মুহূর্তে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া, বিদ্যালয় খালি করা এবং পথে থাকা বাসগুলোকে থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত শত শত পরিবারকে ভয়াবহ শোকের হাত থেকে রক্ষা করে।

নেপালের এই বিপর্যয়ে একটি বিদ্যালয় হারিয়ে গেছে, হারিয়েছে শিশুদের পরিচিত শ্রেণিকক্ষ ও খেলার মাঠ। কিন্তু সময়মতো নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে বেঁচে গেছে ১ হাজার ৬৪৩টি প্রাণ। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও তাই প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবি ও তাঁর সহকর্মীদের দায়িত্বশীলতা হয়ে উঠেছে মানবিক সাহসের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version