মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ‘ট্রাম্প টিভি’ নামে নতুন একটি ২৪ ঘণ্টার ভিডিও সম্প্রচার সেবা চালু করেছে। হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত এই স্ট্রিমে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য, প্রশাসনের ঘোষণা, বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠান এবং পুরোনো নির্বাচিত ভিডিও দেখানো হবে। হোয়াইট হাউসের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ‘TRUMP TV: The Essentials Station’ নামে এর পেজ প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন এই সম্প্রচার শুরু হলো এমন এক সময়ে, যখন সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওয়ের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বড় সংবাদমাধ্যমের বিরোধ তীব্র হয়েছে। সোমবার ওই তিন সংবাদমাধ্যম নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ডিসির ফেডারেল আদালতে মামলাও করেছে।
স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যায় ‘ট্রাম্প টিভি: দ্য এসেনশিয়ালস স্টেশন’-এর সম্প্রচার শুরু হয়। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, এই স্ট্রিমে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও প্রেসিডেন্টের বক্তব্য সরাসরি দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। পুরোনো অনুষ্ঠান ও বক্তব্যের ভিডিওও পুনঃসম্প্রচার করা হচ্ছে।
তবে ‘ট্রাম্প টিভি’ কোনো স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নয়। এটি হোয়াইট হাউস পরিচালিত সরকারি যোগাযোগমাধ্যম, যেখানে কোন ভিডিও বা বক্তব্য দেখানো হবে, সেটি প্রশাসনই নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ স্বাধীন সাংবাদিকদের মতো আলাদাভাবে তথ্য সংগ্রহ, প্রশ্ন করা, সম্পাদনা বা যাচাই করার ভূমিকা এই চ্যানেলের নেই।
এর কয়েক দিন আগে শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওয়ের সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এসব সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে তিনি ‘ফেক নিউজ’ আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ও মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ তোলেন। তবে ওই অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি বলে রয়টার্স জানিয়েছে। পরদিন থেকে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোমবার যৌথভাবে আদালতে যায় সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও। তাদের অভিযোগ, প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুর কারণে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাতিল করা মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে থাকা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং পঞ্চম সংশোধনীর যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার লঙ্ঘন করেছে। তারা নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আদালতের নির্দেশ চেয়েছে। অভিযোগগুলোর আইনি বৈধতা এখন আদালতের বিবেচ্য বিষয়।
হোয়াইট হাউস অবশ্য বলছে, সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার কোনো অধিকার নয়, বরং বিশেষ সুবিধা। ট্রাম্পও দাবি করেছেন, তাঁর পদক্ষেপ স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে নয়; বরং তিনি যেসব প্রতিবেদনকে ‘ফেক নিউজ’ মনে করেন, সেগুলোর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে তিন সংবাদমাধ্যমের বক্তব্য, সরকারের পছন্দ না হওয়া প্রতিবেদনের কারণে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বাতিল করা হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে।
বিরোধের প্রভাব পড়েছে হোয়াইট হাউসের টেলিভিশন পুল ব্যবস্থাতেও। প্রেসিডেন্টকে নিয়মিত ভিডিওতে অনুসরণ করার দায়িত্ব ভাগ করে নেয় সিএনএন, এবিসি, সিবিএস, এনবিসি ও ফক্স নিউজ। পালাক্রমে একটি নেটওয়ার্ক ভিডিও ধারণ করে এবং সেই ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে সরবরাহ করে। সোমবারের দায়িত্ব সিএনএনের থাকার কথা থাকলেও হোয়াইট হাউস তাকে পুলের সূচি থেকে বাদ দেয়।
এর প্রতিবাদে বাকি চার নেটওয়ার্কও প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত পুল ভিডিও কাভারেজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। পাঁচ নেটওয়ার্কের যৌথ বক্তব্যে বলা হয়, জনগণের সরকারের বিষয়ে নির্ভুল ও স্বাধীন তথ্য পাওয়ার স্বার্থ রয়েছে এবং কোনো প্রশাসনের উচিত নয় কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পছন্দ না হওয়ার কারণে সেটিকে বাদ দেওয়া।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হওয়ায় এর সময়কাল বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পক্ষ নতুন স্ট্রিমটিকে সরকারি প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস এটিকে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড সরাসরি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরছে।
সরকার বা প্রেসিডেন্টের নিজস্ব ভিডিও চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি নাগরিকদের কাছে বক্তব্য পৌঁছে দেওয়া অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসন ওয়েবসাইট, টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সরাসরি সরকারি তথ্য প্রচার করেছে। তবে এবার তিনটি বড় সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা, তাদের আদালতে যাওয়া এবং টেলিভিশন পুলের যৌথ কাভারেজ স্থগিত হওয়ার প্রায় একই সময়ে ‘ট্রাম্প টিভি’ চালু হওয়ায় ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে সরকার ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে চলমান বিতর্কের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে।


