লক্ষ্মীপুরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমিনের একটি কথোপকথনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তাঁকে অর্থের বিনিময়ে একটি কাজের কাগজপত্রে সই করার বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়। তবে ভিডিওটি কোন পরিস্থিতিতে ধারণ করা হয়েছে এবং তাঁর সামনে থাকা ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রায় ৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ভিডিওটি রোববার রাতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওর একপর্যায়ে নুরুল আমিনকে সামনে থাকা এক ব্যক্তির সঙ্গে কয়েক কোটি টাকা নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায়।
কথোপকথনের একটি অংশে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘এসি স্যার রাজি হয়ে গেছে, কোনো একটা কারণে, আমি দুই কোটি টাকা থেকে নড়ব না। ৬ কোটি টাকা তিন গুণ না, আমি দুই কোটি টাকার নিচে নড়ব না। চেয়ারম্যানের কাছে যেতে হলে যাব। দেখি চেয়ারম্যান কী কয়।’
এরপর তাঁকে একটি বিলের প্রসঙ্গ তুলে বলতে শোনা যায়, ‘একটা বিলের জন্য যদি ২ কোটি টাকা নিই, তাহলে চেয়ারম্যান কি আমার বিরুদ্ধে যাবে? আমাকে জায়গামতো পোস্টিং দেবে।’
ভিডিওর আরেক অংশে একটি কাজের ব্যয় এবং প্রকল্পের মালামাল আত্মসাতের বিষয়ে কথা বলেন নুরুল আমিন। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘সোজা হিসাব, ৩ লাখ টাকার ওয়ার্কে মালামাল লাগে ৩০ লাখ টাকা। তাহলে কত কোটি টাকার মাল সে আত্মসাৎ করছে। ওই হিসাব করে দেখা যাবে, ৫ কোটি টাকার মাল সে আত্মসাৎ করেছে।’
এরপরই তাঁর মুখে শোনা যায় আলোচিত বক্তব্য—‘৫ কোটি টাকা থেকে আমাকে ২ কোটি টাকা দেন, আমি সব সই করে দেব।’
তবে ভিডিওর এই কথোপকথনের পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্পষ্ট নয়। সামনে বসে থাকা ব্যক্তি কে এবং ঠিক কোন কাজ বা বিল নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, নুরুল আমিন হাতে কিছু একটা নিয়ে সামনে থাকা ব্যক্তির কাছে জানতে চান, ‘এখানে কত?’ জবাবে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘৩৫ স্যার।’ এরপর নুরুল আমিন বলেন, ‘হ্যাঁ, ৩৫, ১ লাখ ৩৫।’ তখন অপর ব্যক্তি তাঁকে বলেন, ‘আগে দিছিলাম এক লাখ, স্যার।’
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে লক্ষ্মীপুর পিডিবির দুই ঠিকাদার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কাজের বিল অনুমোদন ও অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবির অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, ঘুষ না দিলে বিল আটকে রাখা, কাজের অনুমোদন না দেওয়া কিংবা বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এক ঠিকাদারের অভিযোগ, বিল পেতে প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। বিভিন্ন অজুহাতে বিল আটকে রাখার পর একপর্যায়ে ঘুষের প্রসঙ্গ আসে। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে বিরোধে গেলে পরবর্তী সময়ে কাজ পাওয়া এবং বিল ছাড় করানো—দুই ক্ষেত্রেই সমস্যার মুখে পড়তে হয়।
ভাইরাল ভিডিও এবং ঠিকাদারদের অভিযোগের বিষয়ে নুরুল আমিনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে তাঁর কার্যালয়ে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। কার্যালয়ে থাকা পিডিবির এক সহকারী প্রকৌশলী জানান, নুরুল আমিন সকাল থেকে অফিসে আসেননি।
তবে বিষয়টি পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে। পিডিবির কুমিল্লা বিতরণ অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী শেখ ফিরোজ কবির জানিয়েছেন, ভিডিওটি তিনি দেখেছেন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও সেখানে শোনা কথোপকথনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে তদন্তের পরই এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসতে পারে।


