গত ছয় মাসে দেশে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন ১৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৭ জন। কোনো ঘটনায় একই পরিবারের দুজন, আবার কোথাও তিন, চার এমনকি পাঁচজন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন।

সাম্প্রতিক রংপুরের ঘটনা এই ভয়াবহতার নতুন উদাহরণ। মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়। পুলিশ বলছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও হত্যার প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো নানা প্রশ্ন রয়েছে। মামলাটি পরে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এর কিছুদিন আগে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তাঁর তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। শাহিনুর বেগম ও তাঁর তিন মেয়ে সাইমা, ইকরা ও সিপা নিহত হন। পুলিশ প্রাথমিকভাবে মাদকের টাকার জন্য এই হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে বলে জানিয়েছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত যুবক দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায়ও একই পরিবারের দুজনকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁদের ছেলের বিরুদ্ধে। স্বপন দাশ গুপ্ত ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশ গুপ্ত নিহত হন। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে মাদকাসক্তি, বেকারত্ব এবং পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে।

সিলেটেও গত ১২ আগস্ট একই বাসা থেকে ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশ ও নিহতদের স্বজনদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা যায়। ফলে তদন্তের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শুধু এসব ঘটনাই নয়—গত ছয় মাসে আত্রাইয়ে স্ত্রী ও সন্তান হত্যার অভিযোগ, দিনাজপুরে বাবা ও সৎভাই হত্যার ঘটনা, মানিকগঞ্জে ভাবি ও ভাতিজা হত্যার অভিযোগ, রাজধানীর কলাবাগানে স্ত্রী ও শাশুড়ি হত্যার ঘটনা এবং সুনামগঞ্জে দুই শিশুসন্তান হত্যার মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই ঘটনায় পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, মে মাসেই একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত হওয়ার পাঁচটি ঘটনা ঘটেছে। আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেও এমন পাঁচটি ঘটনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ শুধু মে ও আগস্ট মাসেই ১০টি ঘটনায় একই পরিবারের ২৭ জন নিহত হয়েছেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্লেষণ করা ১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটেছে বাড়ি, ভাড়া বাসা, বসতঘর কিংবা আবাসস্থলের ভেতরে। অর্থাৎ যে জায়গাটিকে মানুষ সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেন, সেখানেই ঘটছে ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড।

এসব হত্যার কারণ অবশ্য এক নয়। কোথাও সম্পত্তি বা জমি নিয়ে বিরোধ, কোথাও মাদক, আবার কোথাও দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহের কথা সামনে এসেছে। কোনো কোনো ঘটনার কারণ এখনো অজানা। অন্তত সাতটি ঘটনায় আগে থেকে হুমকি, বিরোধ বা দ্বন্দ্বের তথ্য পাওয়া গেছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব ঘটনার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, বৃহত্তর সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব, প্রতিশোধের প্রবণতা এবং অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও বিচার না হওয়া—সবকিছু মিলেই সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হকের মতে, একেকটি হত্যাকাণ্ডের কারণ আলাদা হলেও এর পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি রয়েছে। তাঁর মতে, মানুষকে পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজ—সব জায়গায় নিরাপদ বোধ করার মতো পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

পুলিশও বলছে, অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পত্তি বা আর্থিক বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতার মতো বিষয় থেকে অনেক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। এসব অপরাধ অনেক সময় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির বাইরেই সংঘটিত হয়।

শুধু হত্যার পর আসামি গ্রেপ্তার করাই সমাধান নয়—অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে বিচারব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতায় যেতে পারে। মানিকগঞ্জে একটি শিশু হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন এক কিশোরের পরিবারের ওপর হামলা এবং গণপিটুনিতে তার বাবা ও চাচার মৃত্যুর ঘটনাও এর উদাহরণ।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, হত্যার মামলাও বেড়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৪৭টি। অর্থাৎ, প্রথম সাত মাসে মামলা বেড়েছে ১২৯টি।

সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন শুধু কতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটল, তা নয়। প্রশ্ন হলো—মানুষ কি নিজের ঘরেও নিরাপদ? পরিবারের ভেতরের বিরোধ, মাদক, সম্পত্তি নিয়ে সংঘাত, প্রতিশোধ এবং দীর্ঘদিনের হুমকিকে যদি সময়মতো শনাক্ত ও মোকাবিলা করা না যায়, তাহলে ছোট বিরোধও ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে রূপ নিতে পারে।

তাই অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা, বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি, মাদক নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর তদন্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতি নয়—নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করার পরও একজন মানুষ যখন নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন, তখনই প্রকৃত নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হয়।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version