বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩, ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

একসময় বিদেশে চাকরির দালাল খুঁজতে যেতে হতো গ্রামের বাজার, চায়ের দোকান কিংবা পরিচিত কারও কাছে। এখন সেই দালালই হাজির হচ্ছে স্মার্টফোনের পর্দায়। একটি ফেসবুক পেজ, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের লোগো, আকর্ষণীয় ছবি আর ‘ফ্রি ভিসা’, ‘নিশ্চিত চাকরি’, ‘মাসে এক লাখ টাকা বেতন’—এমন বিজ্ঞাপন দিয়েই তৈরি করা হচ্ছে বিশ্বাসের ফাঁদ। অর্থাৎ বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসনের পুরোনো দালালি শেষ হয়নি; প্রযুক্তির সঙ্গে বদলে গেছে তার ধরন।

প্রতিবছর দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ কাজের আশায় বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সরকারি হিসাব উদ্ধৃত করে লেখাটিতে বলা হয়েছে, বছরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ তরুণের মধ্যে ৮ থেকে ৯ লাখকে বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ খুঁজতে হয়। তাঁদের অনেকেই বিদেশযাত্রার অর্থ জোগাড় করেন জমি বিক্রি, গয়না বন্ধক কিংবা উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে। ফলে একটি ভুয়া অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবারের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়ায় চাকরি দেওয়ার নামেও বহু বাংলাদেশির প্রতারিত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। একইভাবে মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লার কয়েক শ অভিবাসনপ্রত্যাশী ফেসবুকে সৌদি আরবে ‘ফ্রি ভিসা’র চাকরির প্রলোভনে পড়ে জনপ্রতি প্রায় চার থেকে ছয় লাখ টাকা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের লোগো, নকল স্বাক্ষরসহ নানা উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে অনেকেই জানতে পারেন, তাঁদের পাওয়া ভিসা কাজের অনুমতির জন্য উপযুক্ত নয়।

প্রতারণার এই নেটওয়ার্ক শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখাতেও ফেসবুক, ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপ ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে পাঠানোর ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের নজির রয়েছে।

ডিজিটাল দালালির সবচেয়ে বড় বিপদ হলো এর বিস্তার। আগে স্থানীয় কোনো দালালের পরিচয়, বাড়ি কিংবা সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার সুযোগ থাকত। এখন একটি ফেসবুক পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একই ভুয়া নিয়োগপত্র, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের লোগো কিংবা সাজানো সাফল্যের গল্প একসঙ্গে অসংখ্য চাকরিপ্রার্থীর কাছে পাঠানো সম্ভব।

আর এসব ব্যক্তি নিজেদের ‘দালাল’ হিসেবেও পরিচয় দেন না। কেউ ব্যবহার করেন ‘রিক্রুটমেন্ট কনসালট্যান্ট’, কেউ ‘ভিসা প্রসেসিং এক্সপার্ট’, আবার কেউ নিজেদের বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ‘অফিশিয়াল প্রতিনিধি’ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে হাজারো অনুসারী, বিদেশে থাকা শ্রমিকদের ছবি কিংবা প্রশংসামূলক ভিডিওও থাকতে পারে। ফলে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীর জন্য বৈধ নিয়োগ আর সাজানো প্রতারণার পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের অভিবাসনব্যবস্থায় এই প্রতারণার সুযোগ তৈরির পেছনে তথ্যের অসমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একজন বিদেশগামী কর্মীর কাছে চাকরি, নিয়োগদাতা, বেতন, কাজের শর্ত কিংবা ভিসার বৈধতা যাচাইয়ের যথেষ্ট তথ্য নাও থাকতে পারে। বিপরীতে প্রতারকেরা জানে কোন ছবি, নথি কিংবা তথ্য দেখালে চাকরিপ্রার্থীর বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব।

সরকার অবশ্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড মাইগ্র্যান্টস অ্যাক্টে নিয়োগের সাব-এজেন্ট ও মধ্যস্থতাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২৫ সালের আচরণবিধিতেও সাব-এজেন্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি রিক্রুটমেন্ট এজেন্টস ইনফরমেশন সিস্টেমে দুই হাজারের বেশি রিক্রুটিং এজেন্সি যুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ডিজিটাল প্রতারণা যে গতিতে বদলাচ্ছে, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকেও সেই গতিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শুধু এজেন্সির লাইসেন্স যাচাই নয়; এজেন্সি থেকে সাব-এজেন্ট, ফেসবুক পেজ, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, বিজ্ঞাপন এবং অর্থ লেনদেন—পুরো প্রক্রিয়াকে নজরদারির মধ্যে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সমাধান হিসেবে প্রতিটি বৈধ বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপনের জন্য একটি ইউনিক সরকারি আইডি চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এমন ব্যবস্থা থাকলে ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে কোনো চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে সরকারি প্ল্যাটফর্মে গিয়ে একজন কর্মী সহজেই যাচাই করতে পারবেন চাকরিটি সত্যি কি না, নিয়োগকর্তা কে, বেতন কত, ভিসার ধরন কী, মোট খরচ কত এবং কোন এজেন্সি এর জন্য দায়ী।

একই সঙ্গে শুধু শ্রমিককে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি চাকরির নামে অর্থ সংগ্রহকারী সন্দেহজনক পেজ ও অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।

ডিজিটাল যুগে তাই দালালের ঠিকানা বদলে গেছে। গ্রামের বাজারের জায়গা নিয়েছে ফেসবুকের নিউজফিড, আর সাধারণ মুঠোফোনের জায়গায় এসেছে অ্যালগরিদম ও মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর ক্ষমতা। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে একটি বিজ্ঞাপনে সাড়া দেওয়া তরুণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর পরিবার, ঋণ এবং ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব শুধু বিদেশগামী কর্মীর নয়; নিরাপদ ও যাচাইযোগ্য অভিবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version