সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩, ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৮

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) বর্তমান কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও আরও তিন মাস দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছে। এই সময় শেষে সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে এবং বর্তমান নেতাদের নির্ধারিত কাজের এখতিয়ারও শেষ হবে। তবে এক বছরের কার্যক্রমে নিজেদের অনেক অর্জনের কথা বললেও বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে বর্তমান ডাকসু।

মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য একটি ওয়েবসাইট চালু করে ডাকসু। এই উদ্যোগ নিয়েই ক্যাম্পাসে বড় ধরনের আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি) আগে থেকেই প্রতি সেমিস্টার শেষে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রেখেছে। এর মধ্যে ডাকসুর পক্ষ থেকে আলাদা মূল্যায়ন ওয়েবসাইট চালুর বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গ্রহণ করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরে জানায়, অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালু করা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ঘটনাসহ কয়েকটি বিষয় তদন্তে আলাদা কমিটিও গঠন করা হয়।

শিক্ষক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেমন দ্বিমত না থাকলেও ডাকসুর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জরিপে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ায় সেখান থেকে কোনো শিক্ষক সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। শিক্ষকতা শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; গবেষণা ও অন্যান্য একাডেমিক কর্মকাণ্ডও এর অংশ। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু শিক্ষক মূল্যায়ন নয়, ডাকসু সংগ্রহশালা সংস্কারের বিষয়টিও বর্তমান কমিটিকে বড় বিতর্কের মুখে ফেলেছে। সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একাংশের প্রতিবাদ দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আপত্তি জানায় এবং তদন্ত কমিটি গঠন করে।

এরপর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের একাংশ’ শিরোনামে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির ছবি প্রদর্শন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। আপত্তি ওঠার পর ছবিগুলো দ্রুত বদল করা হয়। অভিযোগ ওঠে, জসীমউদ্‌দীন ও মুনীর চৌধুরীসহ ছয়জনের নামে যেসব ছবি প্রদর্শন করা হয়েছিল, সেগুলোর কোনোটিই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঠিক ছবি ছিল না।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই এক বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর নিজেদের কাজ ও অর্জনের হিসাব তুলে ধরেছেন ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ নেতারা। তাঁদের দাবি, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এক বছরে ৪১টি খাতে এক হাজারের বেশি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডাকসুর সাধারণ সম্পাদকও এক বছরে সহস্রাধিক কল্যাণমূলক উদ্যোগে কাজ করার দাবি করেছেন।

ডাকসু নেতাদের দাবি, হলের আবাসনসংকট নিরসন, রিডিং রুম আধুনিকায়ন ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের পরিবহন সমস্যা সমাধানে তাঁরা ভূমিকা রেখেছেন। পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা, চিকিৎসাসেবা, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্নতা এবং বহিরাগত নিয়ন্ত্রণেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রকাশনার ক্ষেত্রেও নিজেদের সফল দাবি করছে বর্তমান ডাকসু। তাদের হিসাবে, দায়িত্ব পালনকালে অন্তত ৩৬টি প্রকাশনা বের করা হয়েছে।

তবে নিজেদের কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন ডাকসু নেতারা। অন্যদিকে প্রশাসনের অবস্থান হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই ডাকসুকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি উদ্যোগে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগও তুলেছে কর্তৃপক্ষ।

বর্তমান ডাকসুর কর্মকাণ্ড নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে তাদের দায়িত্বের সীমা নিয়ে। ছাত্র সংসদ ও হল সংসদের প্রতিটি পদের দায়িত্ব গঠনতন্ত্রে নির্ধারিত থাকলেও বিভিন্ন সময়ে ডাকসু নেতাদের বিরুদ্ধে এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে মারধরের অভিযোগ, মাঠে খেলতে যাওয়া শিশুদের শাস্তি এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আচরণ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

নির্বাচনের আগে দেওয়া কিছু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যেমন প্রথম বর্ষ থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বৈধ আসন নিশ্চিত করার মতো বিষয় সরাসরি ছাত্র সংসদের একার হাতে নেই। এসব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীতি, অবকাঠামো ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে।

ফলে ডাকসুর এক বছরের মূল্যায়নে যেমন অনেক উদ্যোগের দাবি সামনে আসছে, তেমনি সামনে আসছে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং একাধিক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। বর্তমান কমিটির হাতে এখন আরও তিন মাস সময় রয়েছে। এই সময়ে তাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে চলমান কাজগুলো গুছিয়ে আনা, প্রতিটি উদ্যোগ ও ব্যয়ের হিসাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা এবং প্রয়োজন হলে সেই হিসাব সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছেও প্রকাশ করা।

ডাকসুর মূল দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও শিক্ষাসহায়ক কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করা। তাই ছাত্র সংসদের কার্যক্রম যেন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তে সব শিক্ষার্থীর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় এবং প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের পরিবর্তে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে এগোয়—বর্তমান কমিটির শেষ তিন মাসেও সেই প্রত্যাশাই সামনে থাকবে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version