দেশের বাজারে আবারও বেড়েছে সোনার দাম। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে ২২ ক্যারেট বা ভালো মানের সোনার ভরিতে দাম বাড়ানো হয়েছে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা। এর আগে বৃহস্পতিবার এক ধাপে প্রায় ১০ হাজার টাকা দাম বাড়ানো হয়েছিল। পরদিন শুক্রবার আবার সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২২৬ টাকা পর্যন্ত কমানো হয়। এক দিনের বিরতির পর শনিবার ফের দাম বাড়ায় দেশের সোনার বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) জানিয়েছে, শনিবার সকাল ১০টা থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। স্থানীয় বাজারে তেজাবি বা খাঁটি সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনার দাম বাড়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে বিশ্ববাজারে সোনার দামের সাম্প্রতিক বড় ধরনের উত্থানকে বিবেচনা করা হয়েছে।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের বৈঠকে নতুন করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে কমিটির চেয়ারম্যান দেওয়ান আমিনুল ইসলামের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নতুন দর জানানো হয়।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম এখন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা। এর আগে এই মানের সোনার দাম ছিল ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে প্রতি ভরিতে বেড়েছে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা।
একইভাবে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫৪১ টাকা। আগে এর দাম ছিল ২ লাখ ১৯ হাজার ৩৪২ টাকা। অর্থাৎ ২১ ক্যারেটের সোনার দামও ভরিতে ৪ হাজার ১৯৯ টাকা বেড়েছে।
১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার নতুন দাম হয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৯৩১ টাকা। আগের দাম ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩৭৪ টাকা। ফলে এই মানের সোনার দাম বেড়েছে ৩ হাজার ৫৫৭ টাকা।
এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার দাম বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২২ টাকা করা হয়েছে। আগে এই মানের সোনার দাম ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৮ টাকা। অর্থাৎ সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম বেড়েছে ২ হাজার ৯৭৪ টাকা।
সোনার পাশাপাশি শনিবার রুপার দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট বা ভালো মানের প্রতি ভরি রুপার দাম হয়েছে ৪ হাজার ৮৯৯ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা।
সোনার বাজারে কয়েক দিনের ব্যবধানে পরপর দাম বাড়ানো ও কমানোর ঘটনা এবার বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। গত বৃহস্পতিবার দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট সোনার ভরিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা দাম বাড়ানো হয়েছিল। পরদিন শুক্রবার আবার সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২২৬ টাকা পর্যন্ত দাম কমানো হয়। এরপর শনিবার আবারও বড় অঙ্কে দাম বাড়ানো হলো। ফলে ক্রেতা ও ব্যবসায়ী উভয়ের মধ্যেই বাজারের ভবিষ্যৎ দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিই এই দ্রুত মূল্য পরিবর্তনের অন্যতম কারণ বলে মনে করছে বাজুস। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম এক দিনে ১০০ মার্কিন ডলারের বেশি বেড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েক মাসে এক দিনে এত বড় মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা দেখা যায়নি। গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ১১০ ডলার। এর বড় অংশই এক দিনে বেড়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে।
শুধু সোনা নয়, একই দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতি আউন্স রুপার দাম বেড়েছে ৬৩ ডলারের বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্থানীয় বাজারেও পড়ায় বাংলাদেশে রুপার দামও সমন্বয় করা হয়েছে।
চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। জানুয়ারিতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরে দাম কিছুটা কমলেও ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে আবার সোনার দাম ৫ হাজার ডলারের ওপরে উঠে যায়।
পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আবার কমে ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসে। এরপর প্রায় দুই মাস ধরে সোনার দাম ৪ হাজার ডলারের আশপাশে ঘোরাফেরা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবারও বিশ্ববাজারে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববাজারে সোনার দাম বাড়ার পেছনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত বাড়লে স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশে তেজাবি সোনার দাম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাজুস নিয়মিতভাবে দেশের বাজারের দাম সমন্বয় করে।
এদিকে নতুন করে সোনার দাম বাড়ায় সাধারণ ক্রেতাদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বিনিয়োগের জন্য যারা সোনা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের এখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হবে। কয়েক দিনের মধ্যে বারবার দাম পরিবর্তনের কারণে অনেক ক্রেতা বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে যায়, তার ওপর দেশের বাজারেও পরবর্তী মূল্য পরিবর্তন অনেকটাই নির্ভর করবে। বিশ্ববাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের বাজারেও সোনার দাম আরও বাড়তে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে এলে স্থানীয় বাজারেও নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনা থাকবে।
সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সোনার দাম বাড়া, কমা এবং আবার বাড়ার ঘটনায় দেশের স্বর্ণবাজারে অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শনিবার থেকে ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরির দাম ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩৮ টাকা হওয়ায় দেশের বাজারে মূল্যবান এই ধাতুর দাম আবারও নতুন উচ্চতার দিকে এগিয়েছে।

