বিএনপি সরকারের প্রথম ১৮০ দিনকে অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অপরিণামদর্শিতা ও পরিকল্পনাহীনতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকার মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই পুরোনো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে ফিরে যাচ্ছে।
সোমবার রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ১৮০ দিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। এ সময় দলের পলিসি ও রিসার্চবিষয়ক উপকমিটির তৈরি ‘বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি থেকে পুরোনো রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন—অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা’ শীর্ষক একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করা হয়।
নাহিদ ইসলামের দাবি, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকে ১৮০ দিনের জন্য তিনটি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছিল। এগুলো ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। কিন্তু ছয় মাস পর মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই তিন ক্ষেত্রেই সরকার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি।
বিশেষ করে জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কলকারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদেরও উচ্চমূল্যে সার কিনতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু জ্বালানি সংকট নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ব্যাংকিং খাত, আমদানি ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে পুরোনো সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা।
সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়েও আপত্তি রয়েছে এনসিপির। নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠানগত পরিবর্তনের কিছু বিষয় বাতিল বা দুর্বল করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, এর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বাড়ছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েও সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিশেষ করে জুলাই গণহত্যার বিচার, শহীদ পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম।
আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়েও সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তিনি। বিরোধী দল, মত ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা-মামলা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেন নাহিদ। তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে হামলায় আহত ব্যক্তিরাই আইনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পুলিশকে আবার দলীয় বাহিনীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে শুধু সরকারের সমালোচনা করেই থেমে থাকেননি নাহিদ ইসলাম। বিরোধী দল হিসেবে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য গত ছয় মাসে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বিরোধী দল সরকারকে ভুল ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে তুলে ধরছে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে।
নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সরকার যদি একই পথে চলতে থাকে, তাহলে তাদের ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে পড়তে হতে পারে। তিনি জানান, ১১-দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে শিগগিরই কয়েকটি বিভাগে লংমার্চ এবং পরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে বড় ধরনের রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি পরস্পরবিরোধী। তিনি মনে করেন, ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানির ন্যায্য হিস্যা, পুশ-ইন বন্ধ এবং শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সম্ভাব্য ভারত সফরের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনা অবস্থান করার সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর বাংলাদেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কী বার্তা দেবে, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে স্পষ্ট—সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে বিরোধী পক্ষের অসন্তোষ এখন শুধু সমালোচনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। সামনে ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে বিরোধী দল। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিষয়ে কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এবং আগামী দিনগুলোতে বাস্তব পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

