শিশু হঠাৎ হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছে। কখনো পা শক্ত হয়ে যাচ্ছে, আবার কখনো হাত-পায়ে দুর্বলতা বা অবশভাব দেখা দিচ্ছে। কথা বলতে গিয়ে আটকে যাচ্ছে, এমনকি কোনো কোনো সময় কথা বলাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে কাঁপুনি, অস্বাভাবিক নড়াচড়া কিংবা খিঁচুনির মতো উপসর্গ। আবার কেউ কেউ চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ঘোরা বা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার কথাও জানায়।
অভিভাবকদের জন্য এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের। সন্তান গুরুতর কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয় দুশ্চিন্তা। চিকিৎসকের পরামর্শে একের পর এক পরীক্ষা করানো হলেও অনেক সময় বড় কোনো শারীরিক রোগের প্রমাণ পাওয়া যায় না। তখন পরিবার বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কেউ চিকিৎসক পরিবর্তন করেন, কেউ আবার বারবার পরীক্ষা করাতে থাকেন।
তবে এসব উপসর্গকে একেবারে গুরুত্বহীন ভাবারও সুযোগ নেই। আবার প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুতর কোনো স্নায়ুরোগ হয়েছে—এমনটিও ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শিশুদের এমন কিছু উপসর্গের পেছনে থাকতে পারে ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিজঅর্ডার, অর্থাৎ কার্যকরী স্নায়বিক উপসর্গজনিত সমস্যা।
এ ধরনের সমস্যায় শিশুর শরীরে বাস্তবেই বিভিন্ন স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কিন্তু পরীক্ষায় অনেক সময় বড় কোনো শারীরিক বা কাঠামোগত রোগ ধরা পড়ে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শিশু ইচ্ছা করে এসব উপসর্গ তৈরি করে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীর ও মনের ওপর থাকা চাপ সামলানোর প্রক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের কাজের ধরনে সাময়িক পরিবর্তনের সঙ্গে এ ধরনের উপসর্গের সম্পর্ক থাকতে পারে। তাই শিশুর এমন সমস্যা দেখা দিলে তাকে অভিনয় করছে বা ইচ্ছা করে করছে—এমন অভিযোগ করা ক্ষতিকর হতে পারে।
কেন এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে?
এর পেছনে সব সময় একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। তবে শিশুর মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরীক্ষা বা পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, পরিবারে অশান্তি, স্কুলে বুলিং, অপমান বা হয়রানি, কোনো ধরনের মানসিক আঘাত, অতিরিক্ত প্রত্যাশা কিংবা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে না পারার মতো পরিস্থিতি শিশুর ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো মানসিক সমস্যার সঙ্গেও এ ধরনের উপসর্গের সম্পর্ক থাকতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে শিশুটি নিজেও বুঝতে পারে না যে তার ভেতরে জমে থাকা চাপ শরীরের বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। ফলে বিষয়টি শুধু ‘মনের সমস্যা’ বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। উপসর্গগুলো শিশুর জন্য বাস্তব এবং তার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।
অভিভাবকের করণীয় কী?
এ ক্ষেত্রে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুকে বিশ্বাস করা। তার উপসর্গকে মিথ্যা, অভিনয় বা মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
শিশুকে বকাঝকা করা, লজ্জা দেওয়া কিংবা তার সমস্যাকে উপহাস করা পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একইভাবে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হয়ে শিশুর সব ধরনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়াও উপকারী নয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ধীরে ধীরে শিশুকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে ফেরানো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে নিজের মতো করে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে হাঁটতে সমস্যা, দুর্বলতা, কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অস্বাভাবিক নড়াচড়া, খিঁচুনির মতো ঘটনা, চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো উপসর্গ হলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
স্কুলের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
শুধু পরিবার নয়, শিশুর স্কুল ও শিক্ষকদেরও এ বিষয়ে সচেতন থাকা দরকার। কোনো শিশু যদি বুলিং বা হয়রানির শিকার হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
প্রয়োজনে পড়াশোনার চাপ সাময়িকভাবে কমানো, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ধীরে ধীরে শিশুকে স্বাভাবিক স্কুলজীবনে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে অভিভাবক, শিক্ষক এবং চিকিৎসকের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর শারীরিক উপসর্গের পাশাপাশি তার মানসিক চাপ, পারিবারিক পরিবেশ এবং স্কুলের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখলে অবহেলা করা যাবে না। একই সঙ্গে অকারণে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ, শিশুর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এবং স্বাভাবিক জীবনে ধীরে ধীরে ফেরানোর চেষ্টা—এসবের সমন্বয়েই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

