মার্কিন কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, গীতিকার ও অভিনেত্রী ডলি পার্টন মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই সংগীত তারকা ও সমাজসেবী। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের উপস্থিতিতে ছোট পরিসরে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডলি পার্টনের মুখপাত্র মার্সেল পারিসো জানিয়েছেন, ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াইয়ের পর মৃত্যু হয়েছে তাঁর। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছর ধরে নিজের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা প্রকাশ্যেই জানিয়েছিলেন পার্টন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চে স্বামী কার্ল ডিনের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।

টেনেসির পাহাড়ি অঞ্চলের দরিদ্র একটি পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের কণ্ঠ, গান লেখার অসাধারণ প্রতিভা এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বিশ্বসংগীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন ডলি পার্টন। কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে তিনি শুধু কান্ট্রি সংগীতেই নয়, পপ সংগীত, চলচ্চিত্র, ব্যবসা ও সমাজসেবাতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।
সংগীতে ডলি পার্টনের পথচলা শুরু হয়েছিল গির্জায়। তাঁর নানা সেখানে যাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে স্থানীয় টেলিভিশনে গান গাওয়া শুরু করেন তিনি। আর ১৩ বছর বয়সেই যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ওল ওপ্রি’ মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পান। কিংবদন্তি শিল্পী জনি ক্যাশ সেদিন দর্শকদের সামনে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠ এবং গান লেখার দক্ষতার কারণে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ডলি পার্টন। জীবনে শত শত গান লিখেছেন তিনি। তাঁর লেখা ও গাওয়া কালজয়ী গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জোলিন’, ‘কোট অব মেনি কালারস’, ‘নাইন্টু ফাইভ’ এবং ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’।
বিশ্বজুড়ে তাঁর রেকর্ড ১০ কোটি কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতেও তাঁর গান শতকোটি বারের বেশি শোনা হয়েছে।
১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জোলিন’ গানটি ডলি পার্টনের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। কান্ট্রি সংগীতের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পপ সংগীতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় গানটি। এর পরের বছর, ১৯৭৪ সালে প্রকাশ করেন ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’—যে গান পরবর্তীতে বিশ্বসংগীতের অন্যতম পরিচিত ব্যালাডে পরিণত হয়।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন ডলি পার্টন। ১৯৮০ সালে ‘৯ টু ৫’ চলচ্চিত্রে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান। সিনেমাটির শিরোনাম সংগীতের জন্যও গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। এরপর ‘দ্য বেস্ট লিটল ভোরহাউজ ইন টেক্সাস’ এবং ‘স্টিল ম্যাগনেলিওস’-এর মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।
ব্যবসা ও সমাজসেবাতেও ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। টেনেসিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জনপ্রিয় থিম পার্ক ‘ডলিউড’। পার্কটি পরবর্তীতে ওই অঞ্চলের পর্যটন ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ডলি পার্টন ৫৫টি গ্র্যামি মনোনয়ন পেয়েছেন এবং জিতেছেন ১০টি পুরস্কার। ২০২২ সালে তাঁকে ‘রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে বিশ্বসংগীতের অন্যতম প্রভাবশালী তারকা হয়ে ওঠা ডলি পার্টনের মৃত্যু তাই শুধু একটি সংগীতজগতের নক্ষত্রের পতন নয়; বরং কয়েক প্রজন্মের শ্রোতাদের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক অধ্যায়েরও সমাপ্তি।

