মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের বারবার আইনের আওতায় আনা হলেও দীর্ঘ সময় আটকে রাখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। এর জন্য আইনের ফাঁকফোকরকে দায়ী করে তিনি বলেছেন, অপরাধীরা বেরিয়ে এসে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
শনিবার সকালে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত ‘আমার শহর, আমার দেশ: পরিচ্ছন্নতায় বদলে যাবে বাংলাদেশ’ শীর্ষক পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন আইজিপি।
দেশে ছিনতাই ও মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে আলী হোসেন ফকির বলেন, অনেক মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী একাধিকবার আইনের আওতায় এসেছে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকরের কারণে তাদের দীর্ঘ সময় আটকে রাখা সম্ভব হয়নি।
জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও তুলে ধরেন আইজিপি। সম্প্রতি ছিনতাইয়ের ঘটনায় একজন শিক্ষক নিহত হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসে কেউ কেউ আবার একই অপরাধ করছে। এসব ঘটনা ঠেকাতে জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।
আইজিপির হিসাবে, দেশে প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে পুলিশ সদস্য রয়েছেন মাত্র একজন। তাই শুধু পুলিশের পক্ষে সমাজের সব ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন পুলিশপ্রধান।
পুলিশকে জনবান্ধব হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন আইজিপি। একই সঙ্গে জুলাই বিপ্লবের পর বিভিন্ন জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে পড়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তিনি।
আলী হোসেন ফকির বলেন, বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পুলিশ কাজ করছে। পুলিশ কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সমাজে কী ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে, অতীতে সেটি দেখা গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশকে গালি বা অপমান না করে এই বাহিনীকে সমাজের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান আইজিপি। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব না হলে এবং সবাই মিলে বিশৃঙ্খলা তৈরি করলে সমাজকে সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
অনুষ্ঠানে মাদকাসক্তির সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাব নিয়েও কথা বলেন পুলিশপ্রধান। তিনি বলেন, একজন সন্তান মাদকে জড়িয়ে পড়লে শুধু তার নিজের জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর খেসারত দিতে হয় পুরো পরিবারকে।
নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আইজিপি জানান, মাদকের টাকা না দেওয়ায় সন্তান নিজের বাবাকে মারধর করে আহত করেছে—এমন ঘটনাও তিনি দেখেছেন। এ কারণে নতুন প্রজন্মকে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধ ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে শুধু পুঁথিগত শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমেও তাদের যুক্ত করা প্রয়োজন।
নাগরিক সচেতনতার ঘাটতির উদাহরণ হিসেবে সড়কে চলাচলের নিয়মের কথাও উল্লেখ করেন আইজিপি। তাঁর মতে, অনেকেই রাস্তায় কোন পাশ দিয়ে চলতে হয়, সেটিও ঠিকমতো জানেন না। আবার অনেক চালক জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখেন। অন্য অনেক দেশে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের এ ধরনের নাগরিক নিয়ম শেখানো হয় বলে জানান তিনি।
আইজিপির বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বের বিষয়টিও উঠে আসে। তাঁর মতে, ছিনতাই ও মাদকের মতো অপরাধ দমনে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়; আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর করার পাশাপাশি জনগণকেও পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে।
পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ, কমিউনিটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান শেষে কলেজ প্রাঙ্গণে একটি নিমগাছ রোপণ করা হয়।

