ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ধূমপান থেকে দূরে থাকা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা, পুষ্টিকর খাবার এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার মতো অভ্যাস বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত। তবে কোনো একটি নির্দিষ্ট অভ্যাস মেনে চললেই ক্যানসার প্রতিরোধ করা যাবে—বিষয়টি এমন নয়।
ক্যানসারের অনেক উপসর্গই শুরুতে সাধারণ শারীরিক সমস্যার মতো মনে হতে পারে। দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক ক্লান্তি, হজমের সমস্যায় পরিবর্তন, অকারণে ওজন কমা, ক্ষুধামন্দা বা পেট ও পিঠে স্থায়ী ব্যথার মতো উপসর্গের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এগুলো ক্যানসারের নিশ্চিত লক্ষণ নয়। তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ক্রমে বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকা
ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো তামাক বর্জন। সিগারেটের ধোঁয়ায় বহু ক্ষতিকর ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক থাকে। এগুলো শরীরের কোষ ও ডিএনএর ক্ষতি করতে পারে।
শুধু নিজে ধূমপান না করলেই যথেষ্ট নয়, অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া বা পরোক্ষ ধূমপান থেকেও যতটা সম্ভব দূরে থাকা উচিত। আর ধূমপান কমিয়ে আনার চেয়ে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য বেশি উপকারী।
পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম
ভালো ঘুম সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দ বজায় রাখতে সহায়তা করে। রাতে অতিরিক্ত মোবাইল, ল্যাপটপ বা অন্যান্য স্ক্রিন ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তবে ‘রাত ১১টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যেই শরীর ডিএনএ মেরামত করে’ বা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমালেই টিউমারের বৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব—এমন দাবিকে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাই নির্দিষ্ট একটি সময়কে ক্যানসার প্রতিরোধের উপায় হিসেবে না দেখে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া ভালো।
খাদ্যাভ্যাসে সচেতনতা
ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারকে প্রাধান্য দেওয়া এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত মাংস সীমিত রাখা উপকারী।
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’ নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে। এতে শরীরের কোষীয় কিছু প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হতে পারে। তবে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা না খেলে শরীর ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান ধ্বংস করে দেয়—এমন সরল দাবি এখনো মানুষের ক্ষেত্রে ক্যানসার প্রতিরোধের প্রমাণিত পদ্ধতি নয়। ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
প্লাস্টিক ব্যবহারে সতর্কতা
খুব গরম খাবার এমন প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা উচিত নয়, যা উচ্চ তাপমাত্রার জন্য তৈরি নয়। খাবার সংরক্ষণ ও গরম করার ক্ষেত্রে পাত্রের নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা ভালো।
বিপিএ, কিছু থ্যালেট এবং পিএফএএসের মতো রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে সাধারণভাবে সব প্লাস্টিক বা সব নন-স্টিক পাত্র ব্যবহার করলেই স্তন, জরায়ু, ডিম্বাশয় বা থাইরয়েড ক্যানসারের ঝুঁকি ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়’—এমন সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। নিরাপদ ব্যবহারবিধি অনুসরণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত রান্নার পাত্র পরিবর্তন করা ভালো অভ্যাস।
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
অ্যালকোহল ক্যানসারের একটি প্রতিষ্ঠিত ঝুঁকির কারণ। শরীরে অ্যালকোহল ভাঙার সময় অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি হয়, যা কোষের ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অ্যালকোহল স্তন, মুখ, গলা, খাদ্যনালী, লিভার ও কোলোরেক্টালসহ কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই ক্যানসারের ঝুঁকির দিক থেকে অ্যালকোহল না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। যারা পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে পরিমাণ কমানো ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ক্যানসার প্রতিরোধের কোনো একক ‘ম্যাজিক’ অভ্যাস নেই। তামাক বর্জন, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, স্বাস্থ্যকর ওজন, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং—সবগুলো বিষয় মিলিয়েই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা যায়। পাশাপাশি শরীরে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে থাকলে সেটিকে শুধু ‘গ্যাস্ট্রিক’ বা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

