জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ এখনই যাচ্ছে না। দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ কী ধরনের ব্যবস্থা নেয় এবং আইনি প্রক্রিয়া কোন দিকে যায়, তা পর্যবেক্ষণের পর সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) স্পিকার জানান, জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। তবে শুধু দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে না। এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, সংসদ সচিবালয় বা স্পিকারের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ২২ জুলাই সাংগঠনিক তদন্তের পর গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ভিডিওতে থাকা তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন বলে পরে জানিয়েছিলেন গাজী নজরুল। জামায়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সাংগঠনিক তদন্তে ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। এটি দলটির সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ও ভাষ্য।
বহিষ্কারের পর জামায়াত বিষয়টি স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে জানায়। কিন্তু প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সোমবার জানিয়েছেন, সংসদ সচিবালয় থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি এখনো কমিশনে আসেনি। এমন চিঠি এলে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর মধ্যেই দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আইনি জটিলতায় পড়েছেন গাজী নজরুল। গত রোববার রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অভিযোগগুলো এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
ওই মামলায় গাজী নজরুলকে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত। তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ এর আগে দুজনের সাত দিন করে রিমান্ড চেয়েছিল।
এ পরিস্থিতিতে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্পিকারের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ ও আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি দেখার পর প্রয়োজন হলে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হতে পারে। আদালতের কোনো সিদ্ধান্তও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু দল নিজে কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলে সেই কারণেই তাঁর আসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে—এমন স্পষ্ট বিধান নেই বলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও এর আগে জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার এবং পদে থাকার অযোগ্যতার বিভিন্ন কারণ উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ড পাওয়া এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। তবে গাজী নজরুলের বর্তমান মামলাটি এখনো তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে; তিনি এ মামলায় দোষী সাব্যস্ত হননি।
ফলে বর্তমান অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবেই রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলার তদন্ত, পরবর্তী বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং সংসদ থেকে নির্বাচন কমিশনে কোনো আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স পাঠানো হয় কি না—এসবের ওপর তাঁর এমপি পদ নিয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া নির্ভর করবে।

