একসময় সমাজে ধারণা ছিল, পড়াশোনা শেষ হতে না হতেই বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাবে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে বিয়ে হওয়াকে অনেক পরিবার স্বাভাবিক সময় হিসেবে দেখত। কিন্তু সময় বদলেছে। উচ্চশিক্ষা, চাকরি, ক্যারিয়ার গঠন, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং নিজের জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খোঁজার মতো নানা কারণে এখন অনেকেরই বিয়ে হচ্ছে তুলনামূলক দেরিতে। বয়স ২৪ পেরিয়ে গেলেও বিয়ে না হওয়া তাই অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। তবে পরিবার বা সমাজের চাপের কারণে অনেকেই এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। প্রশ্ন হলো, এমন পরিস্থিতিতে করণীয় কী?
প্রথমেই বুঝতে হবে, বিয়ের জন্য ২৪ বছর কোনো শেষ সময়সীমা নয়। বাংলাদেশের আইনে বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারিত থাকলেও কোন বয়সের মধ্যে অবশ্যই বিয়ে করতে হবে—এমন কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। ব্যক্তির শিক্ষা, পেশা, আর্থিক অবস্থা, মানসিক প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে বিয়ের উপযুক্ত সময় ভিন্ন হতে পারে।
সামাজিক চাপকে সিদ্ধান্তের কারণ বানাবেন না
বয়স বাড়তে থাকলে আত্মীয়স্বজন বা পরিচিতদের কাছ থেকে প্রায়ই প্রশ্ন আসতে পারে—‘বিয়ে করছ না কেন?’ কিংবা ‘আর কতদিন অপেক্ষা করবে?’ এ ধরনের প্রশ্ন অনেকের মধ্যে অস্বস্তি ও মানসিক চাপ তৈরি করে। কিন্তু শুধু অন্যের কথার কারণে তাড়াহুড়া করে জীবনসঙ্গী নির্বাচন করলে পরবর্তী সময়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি সিদ্ধান্ত। তাই বয়সের সংখ্যার চেয়ে দুজন মানুষের বোঝাপড়া, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের প্রত্যাশাগুলো পরিষ্কার করুন
অনেক সময় বিয়ে না হওয়ার পেছনে উপযুক্ত মানুষ না পাওয়ার পাশাপাশি নিজের প্রত্যাশা সম্পর্কেও অস্পষ্টতা কাজ করে। জীবনসঙ্গীর মধ্যে কোন বিষয়গুলো আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি আগে নিজের কাছেই পরিষ্কার হওয়া দরকার।
শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা কিংবা আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি একজন মানুষের আচরণ, সততা, দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা, পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং অন্যকে সম্মান করার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিজের প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত কি না, সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন।
পরিচিতির পরিধি বাড়ানো যেতে পারে
শুধু আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে প্রস্তাব আসার অপেক্ষায় না থেকে বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের পরিচিত ব্যক্তি বা নির্ভরযোগ্য ম্যারেজ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও জীবনসঙ্গী খোঁজা যেতে পারে। তবে অনলাইনে পরিচয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তির পরিচয়, পেশা ও পারিবারিক তথ্য যাচাই না করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
বিয়ের আগে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে কথা বলাও জরুরি। ভবিষ্যতে কোথায় থাকবেন, চাকরি বা পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা, অর্থ ব্যবস্থাপনা, পরিবারকে সহযোগিতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—এসব বিষয়ে দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি আগে থেকেই জানা থাকলে পরবর্তী ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নিজের জীবন থামিয়ে রাখবেন না
‘বিয়ে হচ্ছে না’—এই চিন্তায় নিজের পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং এই সময়টাকে নিজের দক্ষতা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
কারণ বিয়ে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এটিই পুরো জীবন নয়। নিজের একটি স্থিতিশীল অবস্থান তৈরি হলে ভবিষ্যতের পারিবারিক জীবন পরিচালনাও তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
পরিবারকেও বাস্তবতা বুঝতে হবে
অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে নিয়ে ব্যক্তির চেয়ে পরিবারের উদ্বেগই বেশি থাকে। সন্তান ২৪ বা ২৫ বছর পার করলেই দ্রুত বিয়ে দিতে হবে—এমন মানসিকতা থেকে পরিবার অনেক সময় চাপ সৃষ্টি করে। এতে উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচনের বদলে শুধু দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
পরিবারের উচিত সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং বিয়ের মতো সিদ্ধান্তে তার সম্মতি ও প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। একইভাবে যিনি বিয়ে করতে চান, তারও পরিবারের সঙ্গে নিজের পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা খোলামেলাভাবে আলোচনা করা দরকার।
শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও সচেতন থাকুন
বয়স বা বিয়ে নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা যদি ঘুম, কাজ, খাওয়া-দাওয়া বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
একইভাবে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নিজের বয়স, স্বাস্থ্য বা প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে নির্দিষ্ট উদ্বেগের ক্ষেত্রে সামাজিক প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
তাড়াহুড়া নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
২৪ বছর পেরিয়ে গেছে মানেই বিয়ের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন ভাবনার কোনো প্রয়োজন নেই। আবার শুধু বয়স কম বলে বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল পিছিয়ে দেওয়াও সবার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। মূল বিষয় হলো নিজের প্রস্তুতি এবং উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচন।
বিয়ে কখন হচ্ছে, তার চেয়ে কাকে বিয়ে করছেন এবং দুজন সেই সম্পর্কের দায়িত্ব নিতে কতটা প্রস্তুত—সেটিই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই সামাজিক চাপ বা বয়সের হিসাব নয়, বুঝেশুনে এবং নিজের সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার।

