১৯৯২ সালের বিশ্বকাপের কথা উঠলেই পাকিস্তানের সাবেক পেসার আকিব জাভেদের চোখে ভেসে ওঠে একটি মুখ—ইমরান খান। তাঁর বিশ্বাস, পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল অধিনায়ক ইমরানের। দলের অন্যরা যখন শিরোপা জয়ের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখনো বিশ্বাস হারাননি তিনি।
ইমরান খানকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আকিব নেতৃত্বের তিনটি গুণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন—সততা, সাহস ও কঠোর পরিশ্রম। তাঁর মতে, বড় নেতা হওয়ার জন্য এই তিনটি গুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আকিবের ভাষায়, একজন নেতার সততা থাকলে মানুষ তাঁকে সম্মান করে এবং তাঁর কথা শোনে। সাহস থাকলে কঠিন পরিস্থিতিতে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। আর পরিশ্রম একজন নেতাকে লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। ইমরানের মধ্যে এই তিনটি গুণই তিনি দেখেছেন।
তবে ইমরানের নেতৃত্ব আকিব সবচেয়ে কাছ থেকে অনুভব করেছিলেন ১৯৯২ বিশ্বকাপে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমের একটি ঘটনা এখনো তাঁর স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
পার্থে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে পাকিস্তান দলের অবস্থা ভালো ছিল না। ক্রিকেটারদের মনোবলও ছিল নিচের দিকে। এমন অবস্থায় ড্রেসিংরুমে এসে পুরো দলের মানসিকতা বদলে দেন ইমরান।
আকিবের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ইমরান যখন বলেছিলেন যে তিনি এখনো বিশ্বাস করেন পাকিস্তান বিশ্বকাপ জিততে পারে, তখন দলের অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁদের কাছে তখন বিশ্বকাপ জয়ের কথা প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল।
কিন্তু ইমরান শুধু বিশ্বকাপ জয়ের কথা বলেই থেমে থাকেননি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কীভাবে খেলতে হবে, সেটিও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল শুরু থেকেই প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা। রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে খেললে অস্ট্রেলিয়া পাকিস্তানকে চাপে ফেলবে—এমনটাই মনে করেছিলেন অধিনায়ক।
বোলারদের প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল আক্রমণাত্মক। রান আটকানোর চিন্তার চেয়ে উইকেট নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে বলেছিলেন তিনি। বাউন্সার, আউট সুইং থেকে শুরু করে যার হাতে যে অস্ত্র রয়েছে, সবকিছু কাজে লাগানোর বার্তা দিয়েছিলেন।
একই সঙ্গে বিশ্বকাপের সামনের পথটিও খেলোয়াড়দের সামনে সহজভাবে তুলে ধরেছিলেন ইমরান। অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলে সামনে শ্রীলঙ্কা, এরপর নিউজিল্যান্ড এবং তারপর সেমিফাইনাল ও ফাইনাল—এভাবেই সতীর্থদের শিরোপার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তিনি।
সেই বক্তৃতার প্রভাব এতটাই ছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তান দলের ক্রিকেটারদের মানসিকতা পুরোপুরি বদলে যায়। যে দল কিছুক্ষণ আগেও হতাশায় ডুবে ছিল, সেই দলের খেলোয়াড়েরাই মাঠে নামেন জয়ের প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
আকিব নিজেও সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভুলতে পারেননি। তাঁর মনে হচ্ছিল, সামনে কোন ব্যাটসম্যান রয়েছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর ভেতরে এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে মনে হচ্ছিল, সেদিন কোনো ব্যাটসম্যানই তাঁকে সহজে খেলতে পারবেন না।
আকিবের স্মৃতিতে তাই ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ শুধু পাকিস্তানের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের গল্প নয়। এটি এমন এক অধিনায়কের গল্পও, যিনি কঠিন সময়ে নিজের বিশ্বাস পুরো দলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন।
দলের অন্য ক্রিকেটাররা যখন বিশ্বকাপ জয়ের আশা দেখছিলেন না, তখন ইমরান সেই স্বপ্ন আঁকড়ে রেখেছিলেন। আর আকিব জাভেদের চোখে, সেই বিশ্বাস, সাহস এবং নেতৃত্বই শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান দলকে বিশ্বকাপ জয়ের পথে এগিয়ে দিয়েছিল।

