বিএনপি সরকারের আট মাসও পূর্ণ হয়নি। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের ঘিরে হামলা, ভাঙচুর, প্রভাব বিস্তার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজে বাধা দেওয়ার একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। সরকার ও বিএনপি কয়েকটি ঘটনায় সাংগঠনিক এবং আইনি ব্যবস্থা নিলেও প্রশ্ন উঠছে—সেই কঠোর অবস্থানের বার্তা মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর হচ্ছে?
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কাছাকাছি সময়ে ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংগঠন।
এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাজশাহীতে নতুন করে অভিযোগ সামনে এসেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ এবং রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কৃষক দলের এক নেতার নেতৃত্বে চাপ সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এর মধ্যেই চট্টগ্রামে পুলিশের একটি অভিযান ঘিরে তৈরি হয়েছে আরেক বিতর্ক। পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে নগর ভবনে অভিযান চালায় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বগা সেখানে অবস্থান করছেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
অভিযোগ উঠেছে, অভিযানের সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে পুলিশের বাগ্বিতণ্ডা হয় এবং তাঁর হস্তক্ষেপের পর পুলিশ অভিযান শেষ না করেই ফিরে যায়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বগাকে সেখান থেকে চলে যেতে সহযোগিতা করার অভিযোগও ছড়িয়ে পড়ে। তবে মেয়র এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ওই সময় বগা নগর ভবনেই ছিলেন না।
ফলে ঘটনাটিতে পুলিশ ও মেয়রের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পুলিশের অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত হলেও বগা তখন ভবনের ভেতরে ছিলেন কি না এবং তাঁকে পালিয়ে যেতে কেউ সহযোগিতা করেছিলেন কি না—এসব অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি।
এর আগে মিরপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলীয় পর্যায়ে কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। সরকারও দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বার্তা দেয়। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার পর সরকার পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রত হওয়ার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এসব পদক্ষেপের কারণে তখন অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে সরকার ছাড় দেবে না। বিশেষ করে দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা, গ্রেপ্তার এবং একজন নারী সংসদ সদস্যকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা কঠোর অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে আলোচনায় আসে।
কিন্তু পরপর নতুন অভিযোগ সামনে আসায় সেই বার্তার কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে। কেন্দ্র থেকে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হলেও মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ যদি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন—এমন অভিযোগ বারবার উঠতে থাকে, তাহলে শুধু বহিষ্কার কিংবা ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আইনের প্রয়োগ। কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত কি না, সেটির পরিবর্তে অভিযোগের গুরুত্ব ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়াই আইনের শাসনের মূল পরীক্ষা। একইভাবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার অর্থই তিনি অপরাধী—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত মূল প্রক্রিয়া।
মিরপুরের ঘটনার পর নেওয়া ব্যবস্থা যদি সত্যিই একটি উদাহরণ হয়ে থাকে, তাহলে সেই নীতি রাজশাহী, চট্টগ্রাম কিংবা দেশের অন্য যেকোনো জায়গার ক্ষেত্রেও সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে কি না—এখন সেটিই দেখার বিষয়। কারণ সরকারের কঠোর বার্তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বক্তব্যে নয়, বরং দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে প্রতিটি ঘটনায় একইভাবে আইন প্রয়োগের মধ্যেই।

