ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়নের দাবিতে আন্দোলনরত মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ওপর দেশটির পুলিশের নজিরবিহীন বলপ্রয়োগ ও দমন-পীড়ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কাঁদানে গ্যাসের গ্রেনেড হামলায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের চোয়াল ভেঙে যাওয়া এবং অপর এক ১৫ বছর বয়সী কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো নির্মম ঘটনা ঘটেছে। এমনকি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের গাড়ি তুলে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। মানবাধিকারের স্বঘোষিত রূপকার ফ্রান্সের এ ধরনের ভূমিকা এখন জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কড়া নজরদারির মুখে পড়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা ও বিশেষ প্রতিবেদক ফরাসি কর্তৃপক্ষকে আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আহ্বান জানিয়েছেন। পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এছাড়া আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংহতি জানাতে সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও ফ্রান্সে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের তোলা ১০ বিলিয়ন ইউরো বাজেট বরাদ্দের দাবিকে সরকার ‘অবাস্তব’ বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও অর্থনীতিবিদরা বিকল্প আর্থিক সংস্থানের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। অর্থনীতিবিদ এলিস হুইলেরি এবং রোমান প্যারিসের প্রস্তাব অনুযায়ী, কেবল শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর বড় অঙ্কের উত্তরাধিকার সম্পদের ওপর কর সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৬ সালেই ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব আদায় সম্ভব। এই অর্থ দিয়ে শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও সহায়তা প্রদান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বৃদ্ধির সংকট সহজেই নিরসন করা যায়।
ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার চরম বৈষম্য ও সংকট দীর্ঘদিন ধরেই পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলগুলোতে শিক্ষক সংকট, প্রয়োজনীয় স্কুল ডাক্তারের অভাব, শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্তদের মধ্যে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা এবং জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ৯০০ শিক্ষার্থীর স্কুলে ২ হাজার ৩০০ জনকে গাদাগাদি করে রাখার মতো বাস্তবতায় মেয়োতে শুরু হওয়া এ অসন্তোষ মূল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘পারকোর্সাপ’ ব্যবস্থার বৈষম্য, যার ফলে চলতি বছর উচ্চশিক্ষায় বঞ্চিত হয়েছে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক সংকট নিরসনে গঠনমূলক আলোচনার পথে না হেঁটে ফরাসি সরকার কঠোর দমননীতি বেছে নিয়েছে। ৮ অক্টোবরের মধ্যে দেশজুড়ে ৬ হাজার ৮৭৭ জনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু। বিশেষ করে গত ১ অক্টোবর এক দিনেই ১ হাজার ৯৪৯ জনকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ১৯৬১ সালের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড ভেঙেছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে তরুণদের অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরকারের এমন সহিংস প্রতিক্রিয়া চরম নিন্দনীয় ও গভীর সংকটজনক হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

