দেশে সরকারি সেবার বড় একটি অংশ অনলাইনে চালু হলেও তৃণমূল পর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঘাটতি ডিজিটাল সেবা কার্যক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষি অফিসগুলোতে থাকা কম্পিউটারের ৪৪ শতাংশই অকেজো। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সুশাসনবিষয়ক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে সরকারি সাত শতাধিক সেবা অনলাইনে চালু রয়েছে। তবে এসব সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে যেসব স্থানীয় সরকারি কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেগুলোর অনেক জায়গায় প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে কৃষি অফিসে অকার্যকর কম্পিউটারের হার সবচেয়ে বেশি। এসব অফিসে থাকা কম্পিউটারের ৪৪ শতাংশই ব্যবহার উপযোগী নয়। বিপরীতে ইউনিয়ন সমাজকল্যাণ অফিসে অকেজো কম্পিউটারের হার মাত্র ৪ শতাংশ।
কম্পিউটারের পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগের গতিতেও বড় ধরনের বৈষম্য উঠে এসেছে গবেষণায়। ইউনিয়ন কৃষি অফিসে গড় ইন্টারনেট গতি মাত্র ২ দশমিক ৮৭ এমবিপিএস। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ের ইউএনও কার্যালয়ে গড় ইন্টারনেট গতি ২৪ এমবিপিএসের বেশি।
অর্থাৎ উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কার্যালয়ের তুলনায় ইউনিয়ন কৃষি অফিসে ইন্টারনেটের গতি অনেক কম। ফলে অনলাইনভিত্তিক সরকারি সেবা পরিচালনা এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে তৃণমূলের এসব কার্যালয় পিছিয়ে পড়ছে।
বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ইউনিয়ন কৃষি অফিসের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব অফিসের ৯৭ শতাংশেই কোনো ধরনের বিদ্যুৎ ব্যাকআপ ব্যবস্থা নেই। ফলে বিদ্যুৎ চলে গেলে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটনির্ভর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগও থাকে না।
সিপিডির গবেষণায় দেশের সামগ্রিক ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। ১০০ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক ই-গভর্ন্যান্স প্রস্তুতি সূচকের স্কোর এসেছে মাত্র ৩৮ দশমিক ৯।
এর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি। এই খাতে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ২৪ দশমিক ১। অর্থাৎ সরকারি সেবাকে ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ থাকলেও সেই সেবা কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
তৃণমূল পর্যায়ে এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে কৃষি অফিসের মতো সেবাকেন্দ্রে কৃষকদের বিভিন্ন তথ্য ও সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যন্ত্রপাতি অকেজো থাকা কিংবা ইন্টারনেটের গতি কম হলে অনলাইন সেবা কার্যকরভাবে পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল সেবা চালুর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি এখন সেসব সেবা বাস্তবে কার্যকর করার সক্ষমতা তৈরির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সুবিধা বাড়ালে হবে না, ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি কার্যালয়গুলোকেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। এর মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে অন্তত একটি কার্যকর কম্পিউটার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সমাধান দেওয়ার জন্য স্তরভিত্তিক প্রযুক্তি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এতে ইউনিয়ন পর্যায়ে কম্পিউটার, ইন্টারনেট বা সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া সম্ভব হবে।
সিপিডির গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে শত শত সরকারি সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা হলেও ডিজিটাল সেবার সুফল তৃণমূলের মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি অফিসগুলোতে সচল কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে অনলাইন সেবার পরিধি বাড়লেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।



