তিন বছরেরও বেশি সময় পর নীতি সুদহার বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। বুধবারের বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নীতি সুদের লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ৫০ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতার মধ্যেই ফেড এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার পরিবর্তনের প্রভাব শুধু দেশটির অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ডলারের চাহিদা, আন্তর্জাতিক পুঁজিপ্রবাহ, বৈদেশিক ঋণ এবং আমদানি ব্যয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের মতে, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা ভারত, চীন ও ব্রাজিলের মতো দেশের তুলনায় কম। ফলে বড় উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো ফেডের সিদ্ধান্তে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের জায়গা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের চাহিদা। সুদহার বাড়ার কারণে সেখানে ভোক্তা চাহিদা সংকুচিত হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি রপ্তানিতে কিছুটা গতি এলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো ভালো নয়। এর সঙ্গে রয়েছে ভূরাজনৈতিক নানা উত্তেজনা। ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমার পর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও চাহিদা কমলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত বাড়তি চাপে পড়তে পারে।
ফেডের সুদহার বাড়ানোর আরেকটি প্রভাব পড়তে পারে ডলারের চাহিদায়। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বাড়লে মার্কিন বন্ড ও অন্যান্য ডলারভিত্তিক সম্পদে বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফার সুযোগ তৈরি হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে অর্থ সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিতে আগ্রহী হতে পারেন। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার অর্থ আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়া। জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে তখন বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। আমদানি ব্যয় বাড়লে দেশের অভ্যন্তরে পণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে গেলে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানির জন্য আগের তুলনায় বেশি টাকা প্রয়োজন হবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
ফেডের সিদ্ধান্ত বৈদেশিক ঋণের খরচেও প্রভাব ফেলতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ডলারে ঋণ নিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক সুদহার বাড়লে নতুন ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হতে পারে। আবার যেসব পুরোনো ঋণের সুদহার পরিবর্তনশীল, সেগুলোর সুদ ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ডলারের দাম বাড়লে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি অর্থ প্রয়োজন হয়।
এর প্রভাব স্থানীয় ঋণের বাজারেও পৌঁছাতে পারে। মুদ্রার ওপর চাপ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের সুদহার বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে। স্থানীয় সুদহার বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। এতে নতুন বিনিয়োগ কমতে পারে এবং সাধারণ মানুষের ভোগব্যয়ও সংকুচিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের নীতি সহায়ক হলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সরকারের বাজেটেও এর চাপ পড়তে পারে। বৈদেশিক ঋণের সুদ ও পরিশোধ ব্যয় বাড়লে বাজেটে ঋণ পরিশোধের জন্য বেশি অর্থ রাখতে হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় সুদহার বাড়লে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
তবে ফেডের সুদহার বৃদ্ধি এবং এর ফলে কোনো দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক নয়। স্থানীয় মুদ্রার মূল্য কমলে আন্তর্জাতিক বাজারে সেই দেশের রপ্তানি পণ্য তুলনামূলক সস্তা হয়ে যেতে পারে। এতে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অবশ্য এই সুবিধারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদনের জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বাড়ার কারণে এসব কাঁচামালের খরচ বেড়ে গেলে মুদ্রার অবমূল্যায়ন থেকে রপ্তানিকারকের যে সুবিধা পাওয়ার কথা, তার একটি অংশ কমে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ফেডের সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে ডলারের গতিবিধি, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাহিদা, আন্তর্জাতিক পুঁজিপ্রবাহ এবং দেশের নিজস্ব মুদ্রানীতির ওপর। তবে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি—এই তিন ক্ষেত্র এখন বিশেষভাবে নজরে থাকবে।


