রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩, ৮ রবিউস সানি ১৪৪৮

টানা চার বছর কমার পর আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি। সদ্য বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় প্রায় পৌনে ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। গত তিন অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ। তবে করোনাকালে পাট রপ্তানিতে যে রেকর্ড হয়েছিল, সেই অবস্থান থেকে এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে খাতটি।

একসময় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল পাট। সেই ‘সোনালি সময়’ না থাকলেও দেশের রপ্তানি বাণিজ্যে পাট ও পাটপণ্যের গুরুত্ব এখনো রয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে এ খাতের বার্ষিক রপ্তানি আয় ১০০ কোটি ডলারের আশপাশে ছিল। করোনাকালে ২০২০–২১ অর্থবছরে তা একলাফে ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন বা ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছায়। সেটিই ছিল ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রপ্তানি। এরপর টানা চার বছর রপ্তানি কমতে থাকে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সেই নিম্নমুখী ধারা বদলেছে। পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি প্রায় পৌনে ৮ শতাংশ বেড়ে ৮৮ কোটি ডলার হয়েছে। তবে রপ্তানিকারকেরা বলছেন, অর্থের হিসাবে রপ্তানি বাড়লেও পণ্যের পরিমাণে একই ধরনের প্রবৃদ্ধি আসেনি।

এর অন্যতম কারণ কাঁচা পাটের মূল্যবৃদ্ধি। গত বছরের বন্যায় পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে কাঁচা পাটের দাম বেড়ে যায়। ফলে একই পরিমাণ বা তার চেয়ে কম পণ্য রপ্তানি করেও ডলারের হিসাবে বেশি অর্থ এসেছে।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপস প্রামাণিক জানিয়েছেন, বিদায়ী অর্থবছরে প্রতি মণ কাঁচা পাট কিনতে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকায়। আগের বছর এই দাম ছিল তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগে যে পাটপণ্যের মূল্য ছিল ১ হাজার ডলার, সেটিই বেড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে রপ্তানি আয়ের অঙ্কও বেড়েছে।

পণ্যভেদে রপ্তানির চিত্রেও বড় পার্থক্য রয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি ১১ শতাংশ কমে ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পরিমাণের হিসাবে পতন আরও বড়। কাঁচা পাট রপ্তানি প্রায় ৭৭ শতাংশ কমে মাত্র ৩৮ হাজার টনে নেমেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন।

অন্যদিকে পাটের বস্তা রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ডলার হয়েছে। সবচেয়ে বড় আয় এসেছে পাটের সুতা থেকে। এই পণ্যের রপ্তানি আয় ১৮ শতাংশ বেড়ে ৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। যদিও পরিমাণের হিসাবে পাটের সুতা রপ্তানি ২ শতাংশ কমেছে। বিদায়ী অর্থবছরে ৪ লাখ ২৮ হাজার টন পাটের সুতা রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন।

বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাটের পাশাপাশি পাটের সুতা, বস্তা ও বিভিন্ন বহুমুখী পণ্য তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরানসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

বিশ্বে পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। দেশে বছরে প্রায় ৯০ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি প্রতিবেদনে পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি ভবিষ্যতে ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।

তবে বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানিতে এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি আসেনি। বিদায়ী অর্থবছরে ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি কাঁচা পাটের উচ্চ দাম উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে নতুন ক্রয়াদেশেও।

অথচ বৈশ্বিক বাজারে পাটের তৈরি গৃহসজ্জার পণ্য, শপিং ব্যাগ, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, বাগানে ব্যবহৃত সামগ্রী, অটোমোবাইল ও প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদা রয়েছে। চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাটকাঠি থেকে তৈরি চারকোলেরও বাজার রয়েছে।

রপ্তানিকারকদের মতে, পাট খাতকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাতে পরিণত করতে হলে শুধু সুতা ও বস্তার ওপর নির্ভর করলে হবে না। কাঁচা পাটের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গবেষণা, পণ্যের মান উন্নয়ন, নতুন বাজারে প্রণোদনা এবং বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বহুমুখী পাটপণ্যে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের পাট রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version