শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩, ৭ রবিউস সানি ১৪৪৮

দেশের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় মাঝেমধ্যেই ‘ভূত’ বা ‘জিন’-আতঙ্ক ছড়িয়ে একসঙ্গে একাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা সামনে আসে। কোথাও একজন শ্রমিক হঠাৎ অজ্ঞান হওয়ার পর অন্যদের মধ্যেও অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়ে, কোথাও আবার মাথা ঘোরা, বমি ভাব কিংবা পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এসব ঘটনাকে অলৌকিক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় উঠে এসেছে মানসিক চাপ, শারীরিক দুর্বলতা এবং গণমনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি।

গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে নিউএইজ গ্রুপের একটি পোশাক কারখানায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কারখানাটির বাথরুমে দুই নারী শ্রমিক অজ্ঞান হয়ে পড়ার পর সেখানে ‘জিন-আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতীতেও বিভিন্ন কারখানায় কাছাকাছি ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।

এ ধরনের ঘটনায় প্রথমে একজন বা কয়েকজনের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত অন্যদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে একই জায়গায় অবস্থানরত অনেক মানুষের মধ্যে কাছাকাছি ধরনের শারীরিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু পরিস্থিতিতে মাথা ঘোরা, বমি ভাব, পেটব্যথা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আবার একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অনেক মানুষের মধ্যে দ্রুত একই ধরনের উপসর্গ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে ‘গণমনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা’ বা মাস সাইকোজেনিক ইলনেসের ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়।

স্কুল, হোস্টেল কিংবা কারখানার মতো জায়গায়, যেখানে অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় একসঙ্গে অবস্থান করেন, সেখানে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। একজনের অসুস্থতা দেখে অন্যদের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি হলে পরিস্থিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

তবে প্রতিটি ঘটনাকে একই কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করাও ঠিক নয়। কারখানায় একাধিক শ্রমিক হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে শারীরিক অসুস্থতা, কর্মপরিবেশ বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা চিকিৎসা ও যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

পোশাকশ্রমিকদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব, আর্থিক ও পারিবারিক চাপ, খাদ্য ও পুষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা এবং কর্মক্ষেত্রের উদ্বেগ মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে কারখানায় বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটলে শুধু ‘ভূত’ বা ‘জিন’-এর ভয় হিসেবে না দেখে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও কর্মপরিবেশও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অতীতে এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো কারখানায় মিলাদের আয়োজন কিংবা ঝাড়ফুঁকের মতো উদ্যোগ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়টি আলাদা হলেও অসুস্থতার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে একই কারখানায় অনেক শ্রমিকের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, আতঙ্ক কমানো এবং গুজব ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কারখানার আলো-বাতাস, কাজের সময়, বিশ্রামের সুযোগসহ সামগ্রিক কর্মপরিবেশেও কোনো সমস্যা রয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার।

শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। কারখানায় প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা এবং অসুস্থ শ্রমিককে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার ব্যবস্থা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

পোশাকশিল্পে এ ধরনের ঘটনা তাই শুধু কুসংস্কার বা গুজবের বিষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র সামনে আসে না। শ্রমিকের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপ—সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কারণ অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে কার্যকর পথ।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version