রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৮

চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর কুনমিংয়ে বাংলাদেশকে স্থায়ী পণ্য প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রায় চার হাজার বর্গফুটের এই জায়গার জন্য বাংলাদেশকে কোনো ভাড়া দিতে হবে না।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুনমিংয়ের একটি বিপণিবিতানে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য প্রায় ২ হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ থাকবে। এর পাশেই পণ্য সংরক্ষণের জন্য আরও প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের একটি গুদাম পাওয়া যাবে। পুরো সুবিধাটি বিনা মূল্যে দেওয়ার বিষয়টি ইতিমধ্যে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে (ইপিবি) জানিয়েছে চীন সরকার।

একই বিপণিবিতানে আরও কয়েকটি দেশের জন্য স্থায়ী পণ্য প্রদর্শনের জায়গা রয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান চীনের অন্য শহরগুলোতেও নিজেদের পণ্য সরবরাহ করছে। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কুনমিংয়ের এই কেন্দ্র শুধু পণ্য প্রদর্শনের জায়গা নয়, চীনের বৃহৎ বাজারে প্রবেশের একটি স্থায়ী মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ জানিয়েছেন, প্রদর্শনকেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে চুক্তির খসড়া পাঠিয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের মধ্যেই কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে ইপিবি।

এই উদ্যোগের শুরু গত বছরের মে মাসে। সে সময় ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের লানচাং-মেকং উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য উন্নয়ন কেন্দ্রের উপপরিচালক লিউ জিয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে। ইপিবির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকে তারা বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য বিনা মূল্যে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র ও গুদাম দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশও প্রস্তাবটির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখায়।

পরবর্তী সময়ে গত বছরের ডিসেম্বরে ইউনান প্রদেশের টংদে কুনমিং প্লাজায় আয়োজিত একটি ফল উৎসবে ইপিবি ও ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি সই হয়। ওই ফল উৎসবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নয়জন ফল উৎপাদক ও রপ্তানিকারকের একটি দলও অংশ নেয়।

শুধু প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম নয়, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য অনলাইনেও পণ্য বিপণনের সুযোগ রাখা হচ্ছে। ইউনানের নির্ধারিত অনলাইন কমোডিটি সিটিতে বিনা মূল্যে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার কথা রয়েছে। ফলে একটি সমন্বিত ডিজিটাল বিপণন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করতে পারবে।

বিশেষ করে তাজা ফল ও দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত শুল্ক খালাসের সুবিধা পাওয়ার কথাও রয়েছে। এই সুবিধা কার্যকর হলে কৃষি ও খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারকদের জন্য চীনের বাজারে প্রবেশ তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

তবে কুনমিংয়ের স্থায়ী কেন্দ্রে ঠিক কোন কোন বাংলাদেশি পণ্য রাখা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ জানিয়েছেন, চীনের বাজারে যেসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চীনের নিজস্ব মান ও কমপ্লায়েন্সের শর্ত মেনেই পণ্য নির্বাচন করতে হবে।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহা. খোরশেদ আলমও এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ আগে চীন সরকারের কাছে সাতটি জায়গায় স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম চেয়েছিল। আপাতত একটি জায়গায় সেই সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। কুনমিংয়ের উদ্যোগটি সফল হলে ভবিষ্যতে চীনের আরও জায়গায় এমন সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করা হবে।

চীনের বাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে ভালো মানের এবং বাজারে চাহিদা রয়েছে—এমন পণ্য পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন খোরশেদ আলম। তাঁর মতে, চীনে যেসব পণ্যের উৎপাদন কমছে বা সংশ্লিষ্ট কারখানা বন্ধ হচ্ছে, সেই ধরনের পণ্য বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার জায়গা হতে পারে। তবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সবচেয়ে ভালো মানের পণ্য নিয়েই বাজারে যেতে হবে।

বর্তমানে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৯৬ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ চীন থেকে ২ হাজার ২১৪ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৮২ কোটি ডলার।

এই পরিসংখ্যান দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ভারসাম্যহীনতার চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য চীন থেকে আমদানি করলেও দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

চীন ২০২০ সালে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের জন্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা চালু করে। পরে ২০২৪ সালে প্রায় সব বাংলাদেশি পণ্যকেই এই সুবিধার আওতায় আনা হয়। তারপরও বাংলাদেশের পক্ষে চীনের বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

এর মধ্যেই গত জুনে ইপিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কুনমিংয়ে গিয়ে প্রস্তাবিত প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম পরিদর্শন করেছেন। যে বিপণিবিতানে বাংলাদেশকে জায়গা দেওয়া হচ্ছে, সেখানে চীনের পাইকারি ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ফলে সেখানে সারা বছর বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শন করা গেলে সম্ভাব্য ক্রেতা ও পরিবেশকদের কাছে সরাসরি পণ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফের মতে, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ এবং এর মাধ্যমে চীনের বাজারে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চীনের বাজারে চাহিদা, পণ্যের মান ও দেশটির কমপ্লায়েন্সের শর্ত বিবেচনা করেই পণ্য নির্বাচন করতে হবে।

সব প্রস্তুতি শেষ করে চলতি বছরের মধ্যে কুনমিংয়ের স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্রটি চালু করতে চায় ইপিবি। সেটি সম্ভব হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা প্রথমবারের মতো চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরে সারা বছর নিজেদের পণ্য প্রদর্শন, সংরক্ষণ এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে তুলে ধরার স্থায়ী সুযোগ পাবেন।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version