নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও রেস্তোরাঁ পরিচালনার খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে খাবারের দাম সমন্বয় করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। খাবারের দাম বাড়াতে গেলে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে রেস্তোরাঁয় বিক্রি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে বলে দাবি সংগঠনটির।
রেস্তোরাঁ খাতের চলমান সংকট মোকাবিলায় শনিবার রাজধানীর পল্টনের একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ৯ দফা দাবি তুলে ধরে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। সংগঠনের পক্ষে দাবিগুলো তুলে ধরেন মহাসচিব ইমরান হাসান।
সমিতির দাবি, চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, মসলা ও শাকসবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এর পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, এলপিজি, পানি, পরিবহন, বাড়িভাড়া ও শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে। ফলে একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনার সামগ্রিক ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেশি।
অন্যদিকে এই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবারের দাম বাড়ানোর সুযোগও সীমিত বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। দাম বাড়ালে একদিকে ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে। ফলে অনেক রেস্তোরাঁ দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে বলে জানিয়েছে সমিতি।
সংবাদ সম্মেলনে ইমরান হাসান বলেন, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও সেই অনুপাতে খাবারের দাম সমন্বয় করা যাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিলে বিভিন্ন সময় জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে পড়তে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
রেস্তোরাঁর খাবারের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কাঁচামালের ক্রয়মূল্যের পাশাপাশি কর্মীদের মজুরি, গ্যাস-বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রকৃত ব্যয় যাচাই না করে শুধু খাবারের মূল্য সমন্বয়ের কারণে জরিমানা কিংবা হয়রানি বন্ধেরও দাবি তাদের।
রেস্তোরাঁ পরিচালনায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ১০ থেকে ১২ ধরনের অনুমোদন নিতে হয় বলে জানিয়েছে মালিক সমিতি। এতে একটি ব্যবসা শুরু ও নিয়মিত পরিচালনায় অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এ জটিলতা কমাতে রেস্তোরাঁ খাতের জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
তাদের প্রস্তাব, একটি একক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অধীনে সমন্বিত লাইসেন্স ও তদারকির ব্যবস্থা চালু করা হোক। এতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমবে বলে মনে করেন সংগঠনের নেতারা। একই ব্যবস্থার আওতায় নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং রেস্তোরাঁকর্মীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে বলে তাদের মত।
কর নিয়েও বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। রেস্তোরাঁ খাতে বিদ্যমান ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ২ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার চায় তারা। একই সঙ্গে ভ্যাট আদায়ের নামে হয়রানি বন্ধ এবং অনিবন্ধিত রেস্তোরাঁ ও সড়কের পাশের খাবারের ব্যবসাকে ভ্যাটের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীন অভিযান ও জরিমানারও সমালোচনা করেছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা। তাঁদের দাবি, রেস্তোরাঁয় কোনো অভিযান পরিচালনা করা হলে সেখানে মালিক সমিতির একজন প্রতিনিধিকে রাখা উচিত। এসব বিষয়ে হয়রানি বন্ধ না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি দেওয়ার দাবিও জানানো হয়। সংগঠনটির দাবি, দেশে বর্তমানে গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এ অবস্থায় সীমিত পরিসরে মাংস আমদানির সুযোগ দিলে সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছে তারা।
এর পাশাপাশি এলপিজি ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা, লোডশেডিং কমানো, ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং রেস্তোরাঁর কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয়ের চাপ এবং বিক্রি কমে যাওয়ার কারণে রেস্তোরাঁ ব্যবসা বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই শুধু খাবারের মূল্য নিয়ন্ত্রণ নয়, পুরো খাতের ব্যয়, কর, লাইসেন্সিং ও তদারকি ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন রেস্তোরাঁ মালিকেরা।

