প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে বলিউডে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন নানা পাটেকর। অভিনয়ের পাশাপাশি স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব, আপসহীন মনোভাব এবং সাদাসিধে জীবনযাপনের জন্যও আলাদা পরিচিতি ছিল তাঁর। বিপুল অর্থ ও খ্যাতির সুযোগ পেয়েও তারকাসুলভ বিলাসিতার চেয়ে সাধারণ জীবন এবং মানুষের পাশে থাকাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
কাজের ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার জন্যও পরিচিত ছিলেন নানা পাটেকর। মতামত প্রকাশে রাখঢাক না করা এবং পছন্দ না হলে আপস না করার কারণে ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে পরিচালক ও প্রযোজকদের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়েছে। নিজের জেদের কারণে কিছু কাজ হাতছাড়া হওয়ার কথাও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। তবে এসব নিয়ে তাঁকে খুব একটা আক্ষেপ করতে দেখা যায়নি।
অভিনয় দক্ষতায় ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নজর কাড়েন নানা। ধীরে ধীরে বলিউডের প্রথম সারির অভিনেতাদের একজন হয়ে ওঠেন। চাইলে অন্য অনেক তারকার মতো বিলাসবহুল জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তাঁর পোশাক, বাসস্থান ও দৈনন্দিন জীবনে সেই আড়ম্বর খুব একটা দেখা যায়নি।
সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রেও নানা পাটেকরের ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের কৃষক ও খরাপ্রবণ এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে মিলে ‘নাম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন নানা। প্রতিষ্ঠানটি কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ, গ্রাম উন্নয়নসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতেন নানা পাটেকর। কোনো কোনো প্রতিবেদনে তাঁর আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দান করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই হিসাবের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তার তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাঁর দাতব্য কর্মকাণ্ডের আরও কিছু উদাহরণ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। ‘পাঠশালা’ সিনেমায় অভিনয়ের পারিশ্রমিক পাঁচটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দিয়ে দিয়েছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া খরার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করা কৃষকদের পরিবারকেও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে বিদর্ভ, লাতুর ও ওসমানাবাদের কৃষক পরিবারগুলোর পাশে ব্যক্তিগতভাবে দাঁড়ানোর তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
নিজের জীবনযাপনেও ছিল সেই সরলতার ছাপ। ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময়েও মুম্বাইয়ের আন্ধেরিতে প্রায় ৭৫০ বর্গফুটের এক বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন তিনি। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক দশক আগে প্রায় ১ দশমিক ১ লাখ রুপিতে ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সামর্থ্য বাড়লেও বড় কোনো বিলাসবহুল বাড়িতে চলে যাওয়ার বদলে সাধারণ ওই বাসস্থানেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি।
প্রকৃতি ও কৃষিকাজের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। পুনের কাছে খাডাকওয়াসলায় প্রায় ২৭ একরের একটি ফার্মহাউসে নিয়মিত সময় কাটাতেন নানা। সেখানে ধান, গম, পেঁয়াজ ও রসুনসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হতো। ফার্মহাউসের কৃষিপণ্য থেকে পাওয়া আয়ের একটি অংশ স্থানীয় কৃষক ও শ্রমিকদের সহায়তায় ব্যয় করা হতো বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
তারকা জীবনের চাকচিক্যের বদলে ফার্মহাউসে কৃষিকাজ, পশুপালন এবং প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন তিনি। জীবনের শেষদিকে গোয়ার ডোনা পাউলায়ও তাঁর একটি বাড়ি ছিল। মুম্বাই, পুনে ও গোয়ার মধ্যে সময় ভাগ করে নিলেও পুনের ফার্মহাউস ছিল তাঁর বিশেষ পছন্দের জায়গা।
৮ অক্টোবর গোয়ার বাড়িতে অসুস্থ হয়ে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় নানা পাটেকরকে। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
জীবনের শেষদিকে একটি সিনেমায় অভিনয়ের জন্য প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিতেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ নিয়েও ৫০ থেকে ৮০ কোটি রুপির বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। তবে এসব হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়।
গাড়ির ক্ষেত্রেও তাঁর পছন্দ ছিল তুলনামূলক সাদামাটা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর গাড়ির সংখ্যা তিন থেকে চারটির মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি প্রায় দেড় কোটি রুপি মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি না নিয়ে সেই অর্থ কৃষক পরিবারের সহায়তায় ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। অর্জন করেছেন একাধিক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত করেছে।
পর্দায় শক্তিশালী অভিনয় দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়ার পাশাপাশি কৃষক ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো নানা পাটেকরের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছিল। চলচ্চিত্রের ঝলমলে জগতের বাইরে প্রকৃতি, কৃষিকাজ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততাই তাঁর জীবনকে দিয়েছিল ভিন্ন এক পরিচয়।


