পর্দায় প্রচলিত সামাজিক ছকভাঙা উপস্থিতি, সত্যজিৎ রায় থেকে রাজ কাপুরের মতো কিংবদন্তিদের নির্দেশনায় অভিনয়, ব্যক্তিজীবনের বহুল চর্চিত সম্পর্ক এবং পরবর্তীতে টেলিভিশনের পর্দায় তারকাদের গভীর ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বের করে আনার অনন্য শৈলী—সব মিলিয়ে সিমি গাড়োয়ালের জীবন যেকোনো উপন্যাসের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। গত ১৭ অক্টোবর ৭৯ বছরে পা রাখলেন হিন্দি চলচ্চিত্রের এই ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব।
ষাটের দশকের শুরুতে ১৯৬২ সালে ‘টারজান গোজ টু ইন্ডিয়া’ দিয়ে শুরু করে ‘দো বদন’ কিংবা ‘সাথী’র মতো চলচ্চিত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করেন তিনি। তবে ১৯৭০ সালে রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’-এ শিক্ষিকা মেরির ভূমিকায় এক সাহসী দৃশ্যে অভিনয় করে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে ব্যাপক ঝড় তোলেন সিমি। ঠিক দুই বছর পর ১৯৭২ সালে হারমান হেসের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ইংরেজি ছবি ‘সিদ্ধার্থ’-এ শশী কাপুরের বিপরীতে কমলার চরিত্রে নগ্নতা ও ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় ভারতীয় সেন্সর বোর্ডের বাধার মুখে পড়লেও তা তাঁর পেশাদার নিষ্ঠার প্রমাণ দেয়।
শুধু বিতর্কেই তাঁর পরিধি সীমাবদ্ধ ছিল না। সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ও মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’-এর মতো শিল্পসম্মত সমান্তরাল ধারার চলচ্চিত্রে যেমন তিনি আলো ছড়িয়েছেন, তেমনি সুভাষ ঘাইয়ের ‘কর্জ’-এ খল চরিত্র ‘কামিনী’ কিংবা যশ চোপড়ার ‘কাভি কাভি’-তে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রেও নিজের শক্তিশালী ছাপ রেখেছেন। ৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা সিমি সে সময় থেকেই পরিচিত ছিলেন তাঁর পেশাদারিত্ব, সময়নিষ্ঠতা ও চরিত্রের প্রতি গভীর আনুগত্যের জন্য।
ব্যক্তিজীবনেও বারবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন তিনি। কৈশোরে জামনগরের মহারাজা শত্রুশল্যসিংহজি, ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মনসুর আলী খান পতৌদি, পাকিস্তানের প্রয়াত রাজনীতিক সালমান তাসির এবং ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি প্রয়াত রতন টাটার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অধ্যায়গুলো দীর্ঘকাল ধরে চর্চায় থেকেছে। ১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী রবি মোহনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে জড়ালেও ১৯৭৯ সালে বিচ্ছেদের পর তিনি আর বিয়ে করেননি। তবে ব্যক্তিগত জীবনের নানা চড়াই-উতরাইকে ছাপিয়ে সবসময় নিজের পেশাগত মর্যাদা সমুন্নত রেখেছেন এই অভিনেত্রী।
অভিনয়জীবনের পর নিজেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে যান টেলিভিশনের সঞ্চালক হিসেবে। তাঁর উপস্থাপনায় তারকাদের নিয়ে জনপ্রিয় সাক্ষাৎকারভিত্তিক টকশো ‘রঁদেভু উইথ সিমি গাড়োয়াল’ ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসে অনন্য স্থান দখল করে নেয়। মনকাড়া সাদা পোশাক, পরিমিতিবোধ ও শান্ত অথচ নির্ভীক সঞ্চালনার কারণে তিনি পরিচিতি পান ‘লেডি ইন হোয়াইট’ হিসেবে। যেখানে তারকারা অকপটে প্রকাশ করতেন তাঁদের কাজ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, জীবনের ব্যর্থতা ও অপ্রকাশিত সব আবেগ।



