রংপুরের হাজেরা খাতুন তাঁর ১১ মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও চিকিৎসা-সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক খরচ ইতোমধ্যে ৭০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। শুধু অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াই লেগেছে প্রায় ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে প্রতিদিনের খাবার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় যোগ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। হাজেরা জানান, তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকলেও বেতন না পাওয়ায় পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। এমন অভিজ্ঞতা এখন দেশের হাজারো নিম্ন আয়ের পরিবারের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ মূল্যায়নে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় ৯টিই চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে এবং প্রতি ১০টির মধ্যে ৬টি পরিবার তাদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে। দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও যাতায়াত, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, খাবার ও হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকার ব্যয় পরিবারগুলোর জন্য বড় আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের পাশে থাকতে গিয়ে কাজ হারিয়েছেন বা নিয়মিত আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবারই আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ওষুধকে সবচেয়ে জরুরি সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করেছে, ৩৩ শতাংশ নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সহায়তা এবং ২২ শতাংশ খাদ্য সহায়তার দাবি জানিয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, আক্রান্ত পরিবারের ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত এবং তাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আয়ের পরিবারের জন্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত অতিরিক্ত ব্যয় বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। তাই নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠন এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের এই সংকট শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক সংকটও। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে সরকারি সহায়তা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয় বহনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে হাজেরা খাতুনের মতো আরও হাজারো পরিবার ঋণ ও আর্থিক অনিশ্চয়তার চক্রে আটকে পড়বে।



