বর্তমানে ছোট থেকে বয়স্ক—অনেকেরই পরিচিত সমস্যা গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অ্যাসিডিটি। প্রচলিতভাবে এসব সমস্যাকে একসঙ্গে ‘গ্যাস্ট্রিক’ বলা হলেও এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অনিয়মিত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনেকের ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কোন খাবারে সমস্যা হচ্ছে, সেটি বুঝে খাদ্যতালিকা ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ।
আটা-ময়দার তৈরি খাবার খাওয়ার পর কারও কারও পেটে গ্যাস বা অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে গম বা গ্লুটেন সহ্য করতে সমস্যা হলে এ ধরনের খাবার খাওয়ার পর পেট ফাঁপা, ব্যথা কিংবা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে সবার জন্য আটা বা গ্লুটেন বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিভেদে খাবারের প্রতিক্রিয়া আলাদা হতে পারে।
অতিরিক্ত ঝাল ও মসলাযুক্ত খাবারও অনেকের অ্যাসিডিটি বা বুকজ্বালার সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে আগে থেকেই এ ধরনের সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত কাঁচা মরিচ, ঝাল ও বেশি মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই কোন মসলায় সমস্যা বাড়ছে, সেটি লক্ষ্য করে পরিমাণ কমানো যেতে পারে।
তেলেভাজা ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবারও হজমে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। পরোটা, লুচি, চপ, শিঙাড়া, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো ভাজাপোড়া খাবারের পাশাপাশি অতিরিক্ত তেলযুক্ত বিরিয়ানি, পোলাও কিংবা ভারী খাবার হজম হতে তুলনামূলক বেশি সময় নিতে পারে। ফলে পেট ভার লাগা, ঢেকুর বা বুকজ্বালার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আঁশযুক্ত খাবার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও হঠাৎ অতিরিক্ত আঁশ গ্রহণ করলে কারও কারও পেট ফাঁপা ও গ্যাসের সমস্যা হতে পারে। বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খাওয়ার পর এমন সমস্যা হলে পরিমাণ ও রান্নার পদ্ধতির দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু গ্যাসের আশঙ্কায় পুষ্টিকর শাকসবজি পুরোপুরি বাদ দেওয়া ঠিক নয়।
দুধ ও দুগ্ধজাত খাবারও সবার শরীরে একইভাবে সহ্য হয় না। যাঁদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স রয়েছে, তাঁদের দুধ বা কিছু দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর গ্যাস, পেট ফাঁপা, পেটব্যথা কিংবা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা হতে পারে। আবার চা বা কফি কারও কারও অ্যাসিডিটির উপসর্গ বাড়িয়ে দিতে পারে।
গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হলে তুলনামূলক সহজপাচ্য খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে। ভাতের সঙ্গে অল্প তেলে রান্না করা মাছ, পাতলা ডাল ও সবজি রাখা যায়। লাউ, পেঁপে, চালকুমড়া, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, মিষ্টিকুমড়া ও ঢ্যাঁড়সের মতো সবজি অনেকের জন্য সহজে সহনীয় হতে পারে।
ফলের ক্ষেত্রেও ব্যক্তিভেদে সহনশীলতা আলাদা। পাকা পেঁপে, কলা, তরমুজ, বাঙ্গি বা আঙুরের মতো ফল খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে, যদি সেগুলো খাওয়ার পর সমস্যা না বাড়ে। কোনো নির্দিষ্ট ফল খাওয়ার পর বারবার পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হলে সেটির পরিমাণ কমিয়ে দেখা যেতে পারে।
টক দইয়ের মতো কিছু ফারমেন্টেড খাবারে উপকারী জীবাণু বা প্রোবায়োটিক থাকতে পারে। তবে দই খেলেই যে সবার গ্যাস্ট্রিক কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দুগ্ধজাত খাবারে সমস্যা থাকলে দই খাওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিগত সহনশীলতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একইভাবে দারুচিনি, মৌরি বা এলাচ ভেজানো পানি অনেকেই ঘরোয়া উপায় হিসেবে পান করেন। তবে এগুলোকে গ্যাস্ট্রিকের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কারও উপকার হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তন নাও আসতে পারে।
পান্তা ভাতের মতো ফারমেন্টেড খাবারেও কিছু উপকারী অণুজীব তৈরি হতে পারে। তবে এটি প্রস্তুত ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে খাদ্যনিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় উষ্ণ পরিবেশে অনিরাপদভাবে ভাত রেখে দিলে ক্ষতিকর জীবাণু বৃদ্ধির ঝুঁকিও থাকতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের শরীরে কোন খাবার কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে, সেটি পর্যবেক্ষণ করা। একই খাবার একজনের কোনো সমস্যা না করলেও অন্যজনের গ্যাস বা অ্যাসিডিটি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, পরিমিত খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত তেল-ঝাল এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।
আর যদি গ্যাস বা বুকজ্বালার সমস্যা দীর্ঘদিন থাকে, ঘন ঘন ফিরে আসে কিংবা এর সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, গিলতে অসুবিধা, রক্তপাত বা কারণ ছাড়া ওজন কমার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে শুধু খাবার পরিবর্তন বা ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।



