রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩, ২২ রবিউস সানি ১৪৪৮

‘শোলে’র ঠাকুর বলদেব সিং, ‘আঁধি’র জে কে, ‘কোশিশ’-এর হরি কিংবা ‘মৌসম’-এর অমর—একেকটি চরিত্র আজও দর্শকের মনে বাঁচিয়ে রেখেছে সঞ্জীব কুমারকে। বলিউডের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এই তারকার জীবনের শুরুর গল্প অবশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভাবের সংসার, হাতে মাত্র দুই সেট পোশাক আর কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তা—এসবের মধ্য দিয়েই নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি।

চলচ্চিত্র সাংবাদিক হানিফ জাভেরি সম্প্রতি সঞ্জীব কুমারের জীবনের এমন কিছু গল্প জানিয়েছেন, যেখানে পর্দার তারকার চেয়ে ব্যক্তি সঞ্জীবের অন্য এক ছবি উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, বন্ধুদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে গিয়ে প্রায় ৯৬ লাখ রুপি ঋণ দিয়েছিলেন অভিনেতা। সেই অর্থের বড় অংশই আর ফেরত পাননি তিনি।

সঞ্জীব কুমারের আসল নাম হরিহর জেঠালাল জারিওয়ালা। গুজরাটি পরিবারে জন্ম নেওয়া সঞ্জীবের ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। তবে অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার সময় তাঁর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বাবার প্রায় ভেঙে পড়া ব্যবসা সামলানোর চেষ্টা করছিলেন তাঁর মা। আর সঞ্জীব তখন মুম্বাইয়ে অভিনয়ের সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

হানিফ জাভেরির ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময় সঞ্জীবের কাছে পরার মতো মাত্র দুই সেট পোশাক ছিল। কাজের সুযোগও ছিল সীমিত। ফলে যে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব আসত, সেটিই গ্রহণ করতেন তিনি। শুরুর দিকে তাঁর অভিনীত অনেক সিনেমাকে ‘সি গ্রেড’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু সঞ্জীব তখন এসব শ্রেণিবিভাগ নিয়েও খুব একটা ভাবতেন না। তাঁর প্রয়োজন ছিল কাজ এবং পরিবারের জন্য আয়।

ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। অভিনয়দক্ষতা, সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশের ক্ষমতা তাঁকে পরিচালকদের নজরে নিয়ে আসে। ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে তাঁর ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসে।
এরপর ‘খিলোনা’, ‘দস্তক’, ‘কোশিশ’, ‘মৌসম’, ‘আঁধি’, ‘ত্রিশূল’ ও ‘শোলে’র মতো একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন সঞ্জীব। ‘শোলে’তে ঠাকুর বলদেব সিং চরিত্রে তাঁর সংলাপ তুলনামূলক কম হলেও অভিনয় ও উপস্থিতি চরিত্রটিকে ভারতীয় সিনেমার স্মরণীয় চরিত্রগুলোর একটিতে পরিণত করে।

‘কোশিশ’-এ শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেও প্রশংসিত হন তিনি। সংলাপের ওপর নির্ভর না করে অভিব্যক্তির মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির ক্ষমতা দেখিয়েছিলেন সঞ্জীব। ‘কোশিশ’ ও ‘দস্তক’-এ অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন তিনি।

সাফল্যের পর অর্থের অভাব কেটে গেলেও টাকা নিয়ে সঞ্জীবের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা বদলায়নি বলে জানিয়েছেন হানিফ। বলিউডে একসময় তাঁর ‘কৃপণ’ হওয়ার কথাও প্রচলিত ছিল। কিন্তু হানিফের দাবি, নিজের জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ পছন্দ না করলেও বন্ধু ও কাছের মানুষের প্রয়োজনে অর্থ দিতে কখনো পিছপা হতেন না তিনি।

এর বড় উদাহরণ বন্ধুদের দেওয়া ঋণ। হানিফের দাবি, বিভিন্ন সময়ে বন্ধুদের প্রায় ৯৬ লাখ রুপি ধার দিয়েছিলেন সঞ্জীব। এর বড় অংশ আর ফেরত পাননি। অনেক ক্ষেত্রেই অর্থ দেওয়ার আগে কোনো কাগজপত্র বা আইনি নিশ্চয়তাও রাখেননি।
অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেও সঞ্জীব পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন হানিফ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এফটিআইআই থেকে বেরিয়ে বলিউডে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করার সময় অর্থকষ্টে ছিলেন শত্রুঘ্ন। তখন সঞ্জীব তাঁকে ৫ থেকে ৭ লাখ রুপি দিয়ে সহায়তা করেছিলেন। শুধু অর্থ নয়, প্রযোজকদের কাছে শত্রুঘ্নর হয়ে কথাও বলতেন তিনি।

প্রযোজক বনি কাপুরও সঞ্জীবের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন হানিফ। কোনো লিখিত কাগজপত্র ছাড়াই সেই অর্থ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি সঞ্জীবের পরিবারের সদস্যরাও বিষয়টি জানতেন না। পরে সঞ্জীবের মৃত্যুর পর বনি কাপুর তাঁর পরিবারের কাছে সেই অর্থ ফেরত দেন বলে জানিয়েছেন হানিফ।

বন্ধুদের পাশাপাশি নিজের কর্মীদের প্রতিও সঞ্জীবের উদারতার কথা উঠে এসেছে। তাঁর গাড়িচালকের বিয়ের খরচ বহন করেছিলেন তিনি। এমনকি মৃত্যুর আগে উইলে চালকের ছেলের পড়াশোনার জন্য দুই লাখ রুপি রেখে গিয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন হানিফ।

ব্যক্তিজীবনে অবশ্য সঞ্জীব কুমার কখনো বিয়ে করেননি। হেমা মালিনী, নূতন ও সুলক্ষণা পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সুলক্ষণা পণ্ডিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল বহুল আলোচিত। তবে শেষ পর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্ত নেননি সঞ্জীব।

হানিফ জাভেরির ভাষ্য অনুযায়ী, সঞ্জীবের মধ্যে অল্প বয়সে মারা যাওয়ার একটি ভয় কাজ করত। তাঁর পরিবারের অনেক পুরুষ সদস্য ৫০ বছর বয়সের আগেই মারা গিয়েছিলেন। এ কারণে নিজের জীবনও দীর্ঘ হবে না বলে বিশ্বাস করতেন তিনি। তাঁর দুটি হার্ট অ্যাটাক হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন হানিফ। তাঁর দাবি, বিয়ে করে একজন নারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে চাননি সঞ্জীব।
শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৭ বছর বয়সেই সঞ্জীব কুমারের জীবন থেমে যায়। ১৯৮৫ সালের ৬ নভেম্বর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

অভাব থেকে বলিউডের প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা হয়ে ওঠার যাত্রায় সঞ্জীব কুমার পেয়েছিলেন জনপ্রিয়তা, সম্মান ও পুরস্কার। কিন্তু তাঁর জীবনের আরেকটি দিকও সমানভাবে আলোচিত—নিজে অভাবের দিন দেখেছিলেন বলেই হয়তো অন্যের প্রয়োজনকে সহজে উপেক্ষা করতে পারতেন না। পর্দায় অসংখ্য স্মরণীয় চরিত্রের পাশাপাশি বন্ধু, সহকর্মী ও কাছের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্পও তাই সঞ্জীব কুমারের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version