১৯৪৫ সালের আগস্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ব যখন নতুন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছিল, তখন মানবসভ্যতা প্রত্যক্ষ করে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সামরিক হামলার দুটি ঘটনা। ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিক্ষেপ করা দুটি পারমাণবিক বোমা মুহূর্তেই লাখো মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে আরও অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান কিংবা সারা জীবনের জন্য দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে এই হামলার প্রয়োজন ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করলেও, ইতিহাসবিদদের বড় একটি অংশের মতে, যুদ্ধ শেষ করার পাশাপাশি বিশ্বকে নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির আত্মসমর্পণের পর ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হলেও জাপান তখনও আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়নি। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে জাপানের আকস্মিক হামলার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধের সুযোগ খুঁজছিল। ১৯৪৫ সালের জুলাইয়ে পটসডাম সম্মেলনে জাপানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি নেন—পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের অনুমোদন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের গোপন গবেষণা প্রকল্প ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’। ১৯৩৮ সালে পারমাণবিক বিভাজন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়, নাৎসি জার্মানি যদি প্রথমে এই প্রযুক্তি অর্জন করে, তাহলে বিশ্ব ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। সেই আশঙ্কা থেকেই আলবার্ট আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টকে চিঠি লিখেছিলেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে গোপন পারমাণবিক কর্মসূচি, যার বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বে ছিলেন জে. রবার্ট ওপেনহাইমার এবং সামরিক দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল লেসলি গ্রোভস।
১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ‘ট্রিনিটি’ নামে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালানো হয়। প্রায় ২১ কিলোটন টিএনটির সমতুল্য শক্তির বিস্ফোরণে মুহূর্তেই বিশাল আগুনের গোলা, তীব্র আলোর ঝলকানি এবং আকাশজুড়ে মাশরুম আকৃতির ধোঁয়ার মেঘ সৃষ্টি হয়। এই পরীক্ষার মধ্য দিয়েই মানবসভ্যতা পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করে।
সফল পরীক্ষার পর তৈরি করা হয় দুটি ভিন্ন ধরনের পারমাণবিক বোমা। ইউরেনিয়ামভিত্তিক বোমার নাম দেওয়া হয় ‘লিটল বয়’ এবং প্লুটোনিয়ামভিত্তিক বোমার নাম ‘ফ্যাট ম্যান’।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ হিরোশিমার আকাশে ‘লিটল বয়’ নিক্ষেপ করে। প্রায় ১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় বিস্ফোরিত হওয়া বোমাটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। বিস্ফোরণের কেন্দ্রে তাপমাত্রা প্রায় ৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। কেন্দ্রের এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকা হাজারো মানুষ মুহূর্তেই বাষ্পীভূত হয়ে যান। অনেক জায়গায় মানুষের শরীরের পরিবর্তে শুধু দেয়াল বা পাথরের ওপর তাদের ছায়া রয়ে যায়।
ইতিহাসভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণের প্রথম কয়েক মিনিটেই প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার মানুষ নিহত হন। চার দিনের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছে যায়। বছরের শেষ নাগাদ তেজস্ক্রিয়তা, দগ্ধ হওয়া এবং বিভিন্ন জটিলতায় মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
হিরোশিমার মাত্র তিন দিন পর, ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় পারমাণবিক হামলা চালায়। মূল লক্ষ্য ছিল কোকুরা শহর। কিন্তু মেঘ ও ধোঁয়ার কারণে লক্ষ্যবস্তু স্পষ্ট দেখা না যাওয়ায় পাইলট বিকল্প হিসেবে নাগাসাকিকে বেছে নেন। স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২ মিনিটে ‘ফ্যাট ম্যান’ বিস্ফোরিত হয় নাগাসাকির আকাশে।
নাগাসাকির ভৌগোলিক অবস্থান পাহাড়ঘেরা হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা সীমিত হলেও কয়েক সেকেন্ডেই প্রায় ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। বছরের শেষ নাগাদ মৃতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এই ঘটনার পর জাপানি ভাষায় ‘কোকুরা নো কোউন’ নামে একটি নতুন শব্দ যুক্ত হয়, যার অর্থ—অজান্তেই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া।
পারমাণবিক হামলার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। বিস্ফোরণের পর আকাশ থেকে নেমে আসে তেজস্ক্রিয় ‘কালো বৃষ্টি’। তীব্র তৃষ্ণায় অনেকে সেই পানি পান করেন, না জেনেই যে এতে ছিল প্রাণঘাতী বিকিরণ। পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মানুষ ক্যানসার, রক্তক্ষরণ, চুল পড়ে যাওয়া, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং জিনগত জটিলতায় আক্রান্ত হন। যারা বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যান, তাঁদের জাপানে ‘হিবাকুশা’ নামে ডাকা হয়। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি দীর্ঘদিন সামাজিক বৈষম্য এবং অবহেলারও শিকার হন তাঁরা।
এই ধ্বংসযজ্ঞের পর গভীর অনুশোচনায় ভুগতে শুরু করেন পারমাণবিক বোমার অন্যতম নির্মাতা জে. রবার্ট ওপেনহাইমার। ১৯৪৫ সালের ২৫ অক্টোবর তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হোয়াইট হাউসে যান। বৈঠকের একপর্যায়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “মিস্টার প্রেসিডেন্ট, মনে হচ্ছে আমার হাতে রক্ত লেগে আছে।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ট্রুম্যান এই মন্তব্যে সহানুভূতি না দেখিয়ে বিরক্ত হন। তিনি একটি রুমাল বাড়িয়ে দিয়ে ব্যঙ্গ করে বলেন, “তাহলে হাত মুছে ফেলুন।” পরে ট্রুম্যান তাঁর সহযোগীদের নির্দেশ দেন, যেন ভবিষ্যতে আর কখনো ওপেনহাইমারকে তাঁর অফিসে ঢুকতে না দেওয়া হয়। তাঁর ভাষায়, “বোমা আমি ফেলেছি, দায়ও আমার। ওর হাতে কোনো রক্ত নেই।”
পরবর্তীতে ওপেনহাইমার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর বিস্তার রোধের আহ্বান জানান। তিনি মনে করতেন, এই প্রযুক্তি যদি কেবল সামরিক শক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে, তবে মানবসভ্যতা একদিন ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে।
১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাপানের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, পারমাণবিক বোমা ব্যবহার না করলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হতো এবং লাখো মার্কিন ও জাপানি সেনার প্রাণহানি ঘটত। তবে অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষকের মতে, সে সময় জাপান এমনিতেই আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে ছিল। তাঁদের মতে, যুদ্ধ শেষ করার পাশাপাশি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই ছিল পারমাণবিক হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য।
হিরোশিমা ও নাগাসাকির সেই দুই বিস্ফোরণ আজও মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি শুধু যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রতীক নয়, বরং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তার পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে—তারও এক স্থায়ী স্মারক।


