সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে এবার আরও কঠোর পদক্ষেপের পথে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের লক্ষ্য করে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই অভিযানকে ইরানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির জবাবও এসেছে তেহরান থেকে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মাত্রা বাড়ানো হলে পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি এবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই আরও বড় পরিসরে অর্থনৈতিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে যারা সহযোগিতা করছে, তাদেরও এর পরিণতি বিবেচনা করা উচিত।

ওয়াশিংটনের এই অবস্থানের পেছনে মূল লক্ষ্য হলো ইরানের রাজস্বের প্রধান উৎসগুলোর ওপর চাপ তৈরি করা। বিশেষ করে তেল রপ্তানি থেকে ইরানের আয় কমিয়ে দিতে পারলে দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে বড় ঝুঁকি।

কারণ, ইরান যদি সত্যিই তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয় বা হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও কঠোরভাবে বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে এর প্রভাব শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে এই পথে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে সরবরাহ কমে যেতে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ববাজারের তেলের দামে।

ইরানের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে পাল্টা হুমকি দেওয়া হয়েছে। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজাই বলেছেন, অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি বা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথ দিয়ে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।

তেহরানের এই বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, ইরানের হাতে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সক্ষমতা রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক চাপের জবাবে দেশটি সামরিক বা কৌশলগতভাবে জ্বালানি পরিবহনের ওপর চাপ বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানের অর্থনীতিও ইতোমধ্যে ব্যাপক চাপে রয়েছে। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি যুদ্ধ, অবকাঠামোর ক্ষতি, উৎপাদন কমে যাওয়া, বাণিজ্য বাধা ও মূল্যস্ফীতি দেশটির অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব। নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে আমদানি-রপ্তানি আরও কঠিন হতে পারে, মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মূল লক্ষ্য ইরানের সরকার ও অর্থনীতি হলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।

এদিকে ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোকেও চাপের মধ্যে ফেলছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা চীন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বেইজিংকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হলেও চীন জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তারা কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর অর্থ শুধু তেহরানের ওপর চাপ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে চীনসহ ইরানের অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারও।

অন্যদিকে, কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। এর আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়েছে। কাতার, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোও সংকট কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে।

ইরান জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করবেন। আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এই সফরে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে প্রশ্ন হলো—এই কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো কি নতুন অর্থনৈতিক সংঘাত ঠেকাতে পারবে?

কারণ, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও দুর্বল করতে। অন্যদিকে ইরান বলছে, চাপ বাড়লে তারাও তেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথগুলোর ওপর পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।

ফলে সামনে দুটি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা পদক্ষেপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি উভয় পক্ষই কঠোর অবস্থানে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।

আর দ্বিতীয় পরিস্থিতি তৈরি হলে এর প্রভাব ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় আটকে থাকবে না। তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও এর চাপ পড়তে পারে।

তাই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি দেশের ওপর অর্থনৈতিক চাপের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা।

এখন নজর থাকবে ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞার মাত্রা এবং তেহরানের পাল্টা পদক্ষেপের দিকে। কারণ, অর্থনৈতিক ‘ডি-ডে’ যদি সত্যিই শুরু হয়, তার অভিঘাত কতদূর যাবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version