সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা খেলাপি ঋণ। দিনের পর দিন এই ঋণের পরিমাণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ ও অর্থনীতির ওপর তৈরি হয়েছে বড় চাপ। এবার এই সংকট মোকাবিলায় ১৮ মাসের একটি পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাস ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ের সুযোগ রাখা হবে। এরপরের ১২ মাসে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও তা কার্যকর করে দ্রুত খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে এই পরিকল্পনার কথা জানান। সম্প্রতি ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুমোদন করা হলে বিষয়টি সামনে আসে।

শুধু খেলাপি ঋণ আদায় নয়, ঋণের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা—সেটিও শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন গভর্নর। এর মাধ্যমে প্রকৃত ঋণগ্রহীতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। একই সময়ে ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৪৬ শতাংশ।

খেলাপি ঋণের এই বিশাল বোঝা এক দিনে তৈরি হয়নি। গত দেড় দশকে দেশের ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণ, পুনঃতফসিল এবং আদায় প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে আগের তুলনায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় খেলাপি ঋণের অঙ্ক কিছুটা কমে আসে।

তবে এবার শুধু পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সমস্যা সামাল দেওয়ার পরিবর্তে প্রকৃত ঋণগ্রহীতা শনাক্ত ও দায় নির্ধারণের দিকে নজর দিতে চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গভর্নরের দেওয়া পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের সংকট মোকাবিলায় সুদের হার ও ঋণ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইউপিএএস বা মেয়াদি ঋণপত্রের অর্থায়ন সুবিধার ক্ষেত্রে সুদের মার্জিন বেঞ্চমার্ক ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সুদের স্প্রেড সর্বোচ্চ ৪ শতাংশে সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এর লক্ষ্য আমদানি অর্থায়নের খরচ, ঋণের সুদ এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্য কমানো।

এদিকে বড় অঙ্কের ঋণের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ায় অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়ানো হবে।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উদ্যোক্তাদের একটি অভিযোগও উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের চার্জ ও সুদ যোগ হয়ে কার্যকর সুদের হার অনেক ক্ষেত্রে ১৮ থেকে ১৯ শতাংশে পৌঁছে যায়। বিষয়টি পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ ছাড়া ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এই অর্থ যেন প্রকৃত ব্যবসায়ী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা পান, তা নিশ্চিত করতে নজরদারি জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সব মিলিয়ে, প্রথম ছয় মাসের সমঝোতার সুযোগটি হতে পারে খেলাপি ঋণ কমানোর প্রাথমিক ধাপ। তবে এই সুযোগের মাধ্যমে প্রকৃত ঋণগ্রহীতা ও ইচ্ছাকৃত খেলাপির মধ্যে পার্থক্য করা কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কারণ কয়েক লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমানতকারীর অর্থ, নতুন বিনিয়োগের সুযোগ, শিল্প উৎপাদন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা।

তাই আগামী ১৮ মাসে সমঝোতা, আইন প্রণয়ন এবং ঋণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়—তার ওপরই অনেকটাই নির্ভর করবে দেশের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version