ভারতের দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় এবার নোটিশ পেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ বহু পরিচিত ব্যক্তি। নির্বাচন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লিতে ৩৩ লাখের বেশি ভোটারের তথ্যে ‘নো ম্যাপিং’ বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ চিহ্নিত হয়েছে। তাঁদের নথিপত্র যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনীতিকদের পাশাপাশি সাবেক ও বর্তমান উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নামও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও রাজ্যসভার সদস্য কপিল সিব্বাল এবং দিল্লি বিজেপির সাবেক সভাপতি বীরেন্দ্র সচদেবসহ আরও কয়েকজনের ভোটার তথ্য যাচাইয়ের জন্য নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
অরবিন্দ কেজরিওয়ালের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী সুনীতা কেজরিওয়াল, ছেলে পুলকিত, বাবা গোবিন্দ রাম ও মা গীতা দেবীকেও ‘নো ম্যাপিং’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। নির্বাচন কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাঁদের জমা দেওয়া এনুমারেশন ফর্মে এমন পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না, যার মাধ্যমে আগের এসআইআর তালিকার সঙ্গে বর্তমান তথ্যের সংযোগ নিশ্চিত করা যায়। নোটিশ পাওয়ার অর্থ অবশ্য তাঁদের ভোটার হিসেবে অযোগ্য ঘোষণা করা নয়; নথি যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
কেজরিওয়ালের দল আম আদমি পার্টি এই ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করেছে। দলটির প্রশ্ন, দিল্লির তিনবারের একজন মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের তথ্য কেন আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলানো গেল না। তবে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কেজরিওয়ালের নাম ভোটার তালিকা থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ পড়েনি; প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের জন্যই নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তও এসআইআরের নোটিশ পেয়েছিলেন। তিনি শালিমার বাগ বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার। তাঁর ক্ষেত্রে এনুমারেশন ফর্মে মা-বাবার সঙ্গে বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের কম দেখানো হওয়ায় সেটিকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরে বুথ লেভেল অফিসার সরেজমিনে যাচাই এবং প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা করার পর তাঁর ভোটার তথ্য বৈধ বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। ৪ নভেম্বর প্রকাশিতব্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ।
দিল্লির এসআইআর নিয়ে বিতর্কের বড় কারণ বিপুলসংখ্যক ভোটারকে যাচাইয়ের আওতায় আনা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ভোটার আগের নিবিড় সংশোধনের তালিকার সঙ্গে ‘ম্যাপ’ হননি এবং প্রায় ১৯ লাখ ৩৩ হাজার ভোটারের তথ্যে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ পাওয়া গেছে। এই দুই শ্রেণি মিলিয়ে ৩৩ লাখের বেশি ভোটারের তথ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছে। দুই আবেদনকারী আদালতে দাবি করেছেন, কাদের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে এবং কোন নির্দিষ্ট কারণে তাঁদের ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা ‘আনম্যাপড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্ট ২২ সেপ্টেম্বর এ–সংক্রান্ত আবেদন শুনবে বলে জানিয়েছে। এগুলো আবেদনকারীদের অভিযোগ; আদালত এখনো এসব দাবির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেনি।
দিল্লির আগে পশ্চিমবঙ্গেও এসআইআর নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক ও আইনি জট তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়াসংক্রান্ত মোট ৩৮ লাখ ২০ হাজার ৬৮৩টি আপিল জমা পড়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১ লাখ ২ হাজার ২৩১টির নিষ্পত্তি হয়েছে এবং ৩৭ লাখ ১৮ হাজার ৪৫২টি এখনো বিচারাধীন। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশের বেশি আপিলের নিষ্পত্তি বাকি।
নির্বাচন কমিশনের আরেক হিসাবে, পশ্চিমবঙ্গের এসআইআরে বাদ পড়া ২৭ লাখ ১৬ হাজার ভোটারের মধ্যে ২২ লাখের বেশি নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আপিল করেছেন। কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, বিপুলসংখ্যক আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আপিল ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে দিল্লির এসআইআরেও এখন মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—যে বিপুলসংখ্যক ভোটারকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের নথি যাচাই ও দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি কত দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, নোটিশ পাওয়া মানেই কারও ভোটাধিকার বাতিল হওয়া নয়; নথি ও তথ্য যাচাইয়ের পরই চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দিল্লির চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের তারিখ নির্ধারিত রয়েছে ৪ নভেম্বর।



