যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে হামলা চালালে নতুন ধরনের সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করা হবে এবং তা দেখে বিশ্ব ‘বিস্মিত’ হবে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সময়ে ইরানের একদল আইনপ্রণেতা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে দেশটিকে প্রত্যাহারের লক্ষ্যে একটি বিল জমা দিয়েছেন। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের চলমান উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরেও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে ইরানের প্রতিরক্ষামূলক ও পাল্টা আক্রমণের ধরনে ‘উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন’ দেখা যাবে। তবে ইরান ঠিক কোন নতুন অস্ত্র বা সামরিক সক্ষমতার কথা বলছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তাই তেহরানের এই বক্তব্যকে আপাতত সামরিক হুঁশিয়ারি হিসেবেই দেখা হচ্ছে; নতুন অস্ত্রের সক্ষমতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
এর আগে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। তেহরান সতর্ক করেছে, নতুন মার্কিন হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কোনো আঞ্চলিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে হামলায় সহায়তা করলে তাকেও সংশ্লিষ্ট পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
এই সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরানের পারমাণবিক নীতি। দেশটির কয়েকজন আইনপ্রণেতা এনপিটি থেকে ইরানকে প্রত্যাহারের জন্য পার্লামেন্টের প্রেসিডিং বোর্ডে একটি বিল জমা দিয়েছেন বলে সোমবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে বিল জমা পড়ার অর্থ এই নয় যে ইরান ইতিমধ্যে এনপিটি ছেড়ে দিয়েছে। এটি কার্যকর হতে হলে দেশটির নিজস্ব আইনগত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হবে।
মাত্র কয়েক দিন আগেও ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই আল জাজিরাকে বলেছিলেন, এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত তখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক চাপ তেহরানকে ভবিষ্যতে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
এনপিটি ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর। সংস্থাটির বোর্ড ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ‘নন-কমপ্লায়েন্স’ বা বাধ্যবাধকতা না মানার অভিযোগ তুলে বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠিয়েছে। ইরান ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে দায়ী করেছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইরান নিয়ে আবার কঠোর ভাষায় কথা বলেছেন। রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান নিয়ে তিনি এখন ‘সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর্যায়ে’ আছেন এবং সামনে বড় কিছু ঘটতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিবেচনায় থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে আরও সামরিক পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা কিংবা একটি সমঝোতায় পৌঁছানো রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সামরিক হুমকিও দেন। তবে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য; যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে বড় ধরনের হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো সামনে আসেনি। একই সময়ে ট্রাম্প ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৈঠকের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি।
তেহরানও সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করেনি। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে যুদ্ধ বন্ধের কয়েকটি শর্ত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হামলা বন্ধ, জব্দ বা আটকে থাকা ইরানি অর্থ ছাড় এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এখন একই সঙ্গে দুই বিপরীত পথে এগোচ্ছে। একদিকে নতুন অস্ত্র ব্যবহারের হুঁশিয়ারি, এনপিটি ছাড়ার উদ্যোগ এবং সম্ভাব্য নতুন মার্কিন হামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য; অন্যদিকে কাতার ও পাকিস্তানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনার চেষ্টা চলছে। পরবর্তী মার্কিন পদক্ষেপ এবং ইরানের পার্লামেন্টে এনপিটি-সংক্রান্ত বিলের ভবিষ্যৎ এখন এই সংকট কোন দিকে যাবে, তার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।


