যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ ও বিভিন্ন দেশের শোধনাগারে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ডিজেলের বাজারে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পর এখন রপ্তানি সীমিত বা কমানোর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন বা প্রায় ৩ দশমিক ৭৯ লিটার ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫০ ডলার। এক মাস আগেও দাম ছিল ৫ দশমিক ৬১ ডলার। অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই ডিজেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ধরে হিসাব করলে বর্তমান দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি লিটারে প্রায় ২১০ টাকা।
এই পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার দাবি উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রপ্তানি সীমিত করার ধারণার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে তাঁর প্রশাসনের মধ্যেই এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে সতর্ক করেছেন, এমন পদক্ষেপ উল্টো পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম বাড়াতে পারে।
হোয়াইট হাউসও জানিয়েছে, ৯০ দিনের পূর্ণাঙ্গ ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ফলে রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে বাজারে সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা ইতিমধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ানোর আরেকটি কারণ দেশটির কমে আসা ডিজেল ও অন্যান্য ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাবে, ১১ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে ডিস্টিলেট ফুয়েল অয়েলের মজুত ছিল প্রায় ১০ কোটি ৭৮ লাখ ৫৯ হাজার ব্যারেল। ১৮ সেপ্টেম্বর তা সামান্য কমে প্রায় ১০ কোটি ৭৪ লাখ ৩১ হাজার ব্যারেলে দাঁড়ায়।
বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের পেছনে রাশিয়ার পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় দেশটির বিভিন্ন শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন ও রপ্তানিতে চাপ তৈরি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজার সামাল দিতে রাশিয়াও বিভিন্ন সময়ে ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দিয়েছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিকের যুক্তি, রপ্তানি কমিয়ে দেশের ভেতরে বেশি ডিজেল ধরে রাখা গেলে স্থানীয় সরবরাহ বাড়বে এবং তাতে দাম কমতে পারে। কিন্তু জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলো বিপরীত সমস্যায় পড়তে পারে। বিদেশে বিক্রির সুযোগ না থাকলে দেশে ডিজেলের মজুত দ্রুত বাড়তে পারে। সংরক্ষণক্ষমতা সীমিত হয়ে এলে শোধনাগারগুলো অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত ডিজেলের পাশাপাশি পেট্রল ও উড়োজাহাজের জ্বালানির উৎপাদনও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বাজারে এমন আশঙ্কা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের দামের ব্যবধানেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ডিজেলের বড় রপ্তানিকারক হওয়ায় দেশটি রপ্তানি কমালে এর প্রভাব শুধু মার্কিন বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। লাতিন আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ইউরোপের বাজারেও সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরবরাহ কমলে এসব দেশের ক্রেতাদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। কিন্তু বর্তমানে রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহও চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে একই সীমিত সরবরাহের জন্য বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ডিজেলের মজুত কম এবং দাম রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে।
রপ্তানি সীমিত করার প্রভাব সড়ক পরিবহনেই আটকে থাকবে না। ডিজেলের দাম ও শোধনাগারের উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তন এলে উড়োজাহাজের জ্বালানিসহ অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের দামেও চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।
এ কারণে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে স্বেচ্ছামূলকভাবে রপ্তানি কমানোর মতো বিকল্প নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন ডিজেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি।
মূল প্রশ্ন এখন একটাই—দেশের ভেতরে দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্র যদি ডিজেল রপ্তানি সীমিত করে, সেটি সত্যিই মার্কিন ভোক্তাদের স্বস্তি দেবে, নাকি উৎপাদন কমিয়ে বিশ্ববাজারের সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে। বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা দ্বিতীয় ঝুঁকিটিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।



