গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজধানী ঢাকায় মহাসমাবেশের পাশাপাশি দেশের চার বিভাগে ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ধাপে ধাপে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে জোটটি। রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদেও এ কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের অবস্থান কর্মসূচি থেকে এই ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অবস্থান কর্মসূচিতে জোটভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন।
ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মাধ্যমে কর্মসূচির যাত্রা শুরু হবে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। ধারাবাহিক এই কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটবে আগামী ১৪ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় একটি মহাসমাবেশের মাধ্যমে।
১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা জানিয়েছেন, এসব কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জোরালো করা এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা। একই সঙ্গে দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের বিভিন্ন দিক জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, লংমার্চ শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পথিমধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সভা ও সমাবেশের আয়োজন করা হবে, যেখানে জনগণের সঙ্গে মতবিনিময় এবং রাজনৈতিক বক্তব্য তুলে ধরা হবে। তিনি বলেন, প্রতিটি কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জনগণকে অবহিত করার চেষ্টা করবে ১১ দলীয় ঐক্য।
তিনি আরও জানান, খুলনাগামী লংমার্চ শেষে যশোর ও কুষ্টিয়া হয়ে ঢাকায় ফিরবেন জোটের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে চট্টগ্রাম, রংপুর ও খুলনার কর্মসূচি বাসযোগে অনুষ্ঠিত হলেও সিলেটগামী লংমার্চ হবে রেলপথে। রেলপথে এই কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে ভিন্নধর্মী রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা উচিত নয়। তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, লংমার্চ যেন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হতে পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা উচিত। তার দাবি, যদি এসব কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে আন্দোলনের গতি ও জনসমর্থন আরও বাড়বে।
অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ ও শিল্পখাত উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি এবং তাদের ভাষায় ‘ভূতুড়ে বিল’-এর কারণে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
বক্তারা আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তাদের আন্দোলনের অন্যতম কারণ। জনগণের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করার পথে হাঁটছে বলেও অভিযোগ তোলেন তারা।
১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা দাবি করেন, দেশের জনগণ বর্তমানে নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। সেই লক্ষ্যেই ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনমত সংগঠিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অবস্থান কর্মসূচিতে জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য দেন। তারা ঘোষিত লংমার্চ ও মহাসমাবেশ সফল করতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জনগণকে এসব কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামী কয়েক মাসে ধারাবাহিক লংমার্চ ও মহাসমাবেশের মতো কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এসব কর্মসূচি নিয়ে কী ধরনের অবস্থান নেওয়া হবে, সেটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচিগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


