মানবজাতিকে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে মহান আল্লাহ সর্বশেষ নবী ও রাসুল হিসেবে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে পাঠান। তাঁর জন্ম থেকে ওফাত পর্যন্ত পুরো জীবন মানবতার জন্য অনন্য শিক্ষা ও আদর্শে পরিপূর্ণ। ইসলামী ঐতিহ্য অনুযায়ী, পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসে তাঁর শুভাগমন মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের আগেই পিতা ইন্তেকাল করেন। শৈশবে তৎকালীন আরবের রীতি অনুযায়ী তিনি হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে প্রতিপালিত হন। পরবর্তী সময়ে দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁর দেখাশোনা করেন। আট বছর বয়সে দাদার ইন্তেকালের পর চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন তিনি।
মাত্র ১২ বছর বয়সে চাচা আবু তালিবের সঙ্গে একটি ব্যবসায়িক কাফেলায় সিরিয়া সফর করেন মহানবী (সা.)। কৈশোর ও তারুণ্য থেকেই সততা, বিশ্বস্ততা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করার কারণে সমাজে তিনি বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন। অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কাজ করা ‘হিলফুল ফুজুল’ উদ্যোগেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
২৩ বছর বয়সে হজরত খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। তাঁর সততা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে খাদিজা (রা.) বিবাহের আগ্রহ প্রকাশ করেন। ২৫ বছর বয়সে তাঁদের বিয়ে হয়। পরবর্তী জীবনে খাদিজা (রা.) মহানবী (সা.)-এর অন্যতম প্রধান সহযোগী ও ইসলামের প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে ওঠেন।
৩৫ বছর বয়সে কাবা শরিফ সংস্কারের সময় হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন নিয়ে বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও মহানবী (সা.) এমন একটি সমাধান দেন, যাতে সব পক্ষই অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এরপর তিনি নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ নির্ধারিত স্থানে স্থাপন করেন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মক্কার সমাজে বিদ্যমান অন্যায়, বৈষম্য ও নৈতিক অবক্ষয় তাঁকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। তিনি হেরা গুহায় নির্জনে সময় কাটাতে শুরু করেন। ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে তাঁর ওপর নবুয়ত প্রকাশিত হয়।
প্রথমদিকে তিনি ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে প্রকাশ্যে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন। এক আল্লাহর ইবাদত, মানুষের সমতা, দরিদ্র ও অসহায়ের অধিকার এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তৎকালীন মক্কার প্রভাবশালী কুরাইশদের বিরোধিতার মুখে পড়ে।
ইসলামের দাওয়াতের পথে মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের কঠিন নির্যাতন ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যেই ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) এবং চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। এই সময়টি তাঁর জীবনের অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায় হওয়ায় বছরটি ‘আমুল হুজন’ বা দুঃখের বছর নামে পরিচিত।
এরপর ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি তায়েফে যান। সেখানেও তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়। পরের বছর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসে এই হিজরত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
মদিনায় পৌঁছে মহানবী (সা.) একটি নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলেন। বিভিন্ন ধর্ম, গোত্র ও সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করে প্রণয়ন করা হয় ‘মদিনা সনদ’। এর মাধ্যমে পারস্পরিক সহাবস্থান, নিরাপত্তা এবং সামাজিক দায়িত্বের একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়।
হিজরতের পর মুসলমানদের একাধিক যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়। বদর ও ওহুদের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে এই সময়ে। পরবর্তী সময়ে ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় দেড় হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মহানবী (সা.) ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার দিকে যাত্রা করেন। কুরাইশদের বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি হয়, যা ইতিহাসে ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত।
পরবর্তী সময়ে চুক্তি ভঙ্গের প্রেক্ষাপটে ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় ১০ হাজার সাহাবিকে নিয়ে মহানবী (সা.) মক্কায় প্রবেশ করেন। মক্কা বিজয়ের পর তাঁর সামনে প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি সাধারণ ক্ষমার নীতি গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের নির্যাতন ও বিরোধিতার পরও শত্রুদের ক্ষমা করার এই ঘটনা মহানবী (সা.)-এর জীবনের অন্যতম আলোচিত শিক্ষা হয়ে রয়েছে।
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজ সম্পন্ন করেন। বিপুলসংখ্যক সাহাবির উপস্থিতিতে দেওয়া বিদায় হজের ভাষণে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা, পারস্পরিক অধিকার, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন তিনি।
বিদায় হজের প্রায় ৯০ দিন পর ৬৩ বছর বয়সে মদিনায় হজরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ওফাত লাভ করেন। সেখানেই তাঁর রওজা মোবারক অবস্থিত।
মহানবী (সা.)-এর জীবন কেবল একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়; মুসলমানদের কাছে তাঁর জীবনাদর্শ দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার পথনির্দেশনা। সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ধৈর্য, ক্ষমা, ন্যায়বিচার, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা অনুসরণই তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অন্যতম প্রকাশ।



