বিতর্কিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের উপকূলের কাছে পরিকল্পিত একটি ব্রিটিশ-ইসরাইলি তেল প্রকল্প বন্ধের দাবিতে আর্জেন্টিনার আদালতে মামলা করেছেন দেশটির কয়েকটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা। মঙ্গলবার দায়ের করা এই মামলার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ফকল্যান্ড বিরোধে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। খবর এএফপির।
আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে ‘লাস মালভিনাস’ নামে অভিহিত করে এবং দ্বীপপুঞ্জটির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। বর্তমানে অঞ্চলটি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৮২ সালে দ্বীপপুঞ্জটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেছিল আর্জেন্টিনা। তবে ব্রিটেনের সঙ্গে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
নতুন মামলার কেন্দ্রে রয়েছে ‘সি লায়ন’ নামে পরিচিত একটি তেলক্ষেত্র। ব্রিটিশ কোম্পানি রকহপার এক্সপ্লোরেশন এবং ইসরাইলি কোম্পানি নাভিটাস পেট্রোলিয়াম যৌথভাবে সেখানে তেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়।
মামলাকারীদের মধ্যে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সাবেক সৈনিক ও পরিবেশবিষয়ক আইনজীবীরা রয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রায় ২২০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রে বড় আকারে তেল উত্তোলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মামলাকারীদের দাবি, প্রকল্পটি জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কোনো ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ চলমান থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এমন কোনো একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যা বিদ্যমান বিরোধকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তেল প্রকল্পটি অবশ্য ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তারপরও মামলাকারীরা মনে করছেন, আর্জেন্টিনার স্থানীয় আদালত থেকে তাঁদের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত এলে সেটি প্রকল্পটির অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবেশবিষয়ক আইনজীবী এনরিক ভিয়ালে এএফপিকে জানিয়েছেন, আদালতের কাছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে প্রকল্পের কাজ শুরু বা চালিয়ে যাওয়া এবং হাইড্রোকার্বন উত্তোলন ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার আবেদন করা হয়েছে।
এমন এক সময়ে মামলাটি করা হলো, যখন ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ঘিরেও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। মামলার মাত্র এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থান পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করেননি।
সোমবার সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্র ফকল্যান্ড নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি সব অবস্থানই পর্যালোচনা করি। এটি সেগুলোর মধ্যে একটি।’
ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে মালভিনাস ইস্যু নিয়ে কথা বলবেন।
ফকল্যান্ড বা মালভিনাসকে আর্জেন্টিনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে মিলে প্রশ্ন করেন, জাতীয় স্বার্থের জন্য মালভিনাসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত আর কী বিষয় থাকতে পারে?
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে বিরোধ আর্জেন্টিনায় দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ও জাতীয় ইস্যু। সম্প্রতি খেলাধুলার মাঠেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে।
গত জুলাইয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ২-১ গোলের জয়ের পর আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলার একটি ব্যানার তুলে ধরেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘লাস মালভিনাস আর্জেন্টিনার।’
এর প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি দপ্তর ডাউনিং স্ট্রিটের এক মুখপাত্র মন্তব্য করেন, ‘বিশ্বকাপ হয়তো আমাদের নয়, কিন্তু ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ অবশ্যই আমাদের।’
ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের বিরোধের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৮২ সালে। আর্জেন্টিনা দ্বীপপুঞ্জটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার অঞ্চলটি পুনর্দখলে নৌবহর পাঠান।
এরপর দুই দেশের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন, ২৫৫ জন ব্রিটিশ এবং তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন। শেষ পর্যন্ত দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে ব্রিটেন।
চার দশকের বেশি সময় পরও সেই বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। এবার ফকল্যান্ডের কাছে তেল উত্তোলনের পরিকল্পনা, আর্জেন্টিনার আদালতে মামলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য—সব মিলিয়ে পুরোনো এই ভূখণ্ড বিরোধ আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।



