রাজবাড়ীর পাংশায় প্রস্তাবিত গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব, পানি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তের হালনাগাদ অবস্থা নিয়ে ১০টি প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ বিস্তারিত তথ্য জনসাধারণের জন্য প্রকাশ এবং প্রকল্পের সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
গত ২২ আগস্ট রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) যৌথভাবে ‘গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ: কতিপয় প্রশ্ন ও প্রস্তাব’ শীর্ষক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সেখানে বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এবং বেনের বৈশ্বিক সমন্বয়ক অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান যৌথভাবে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
আলোচনায় প্রথমেই প্রকল্পটি ঘিরে পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ না করার অভিযোগ তোলা হয়। পরিবেশবিদদের প্রশ্ন, এত বড় ও ব্যয়বহুল প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল, ঝুঁকি, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে জনগণের সামনে বিস্তারিত তথ্য কেন নেই। তাঁরা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের দাবি জানান।
সরকার গত ১৩ মে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় অনুমোদন করেছে। প্রথম পর্যায়ের অনুমোদিত ব্যয় প্রায় ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। পুরো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। রাজবাড়ীর পাংশায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে প্রবাহ বাড়ানো, সেচের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করা।
কিন্তু বাপা ও বেনের আলোচনায় প্রশ্ন তোলা হয়, ব্যারাজে বর্ষাকালের পানি ধরে রেখে তা শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ব্যারাজের কারণে পাংশার ভাটিতে নদী ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে পানিপ্রবাহের কী পরিবর্তন হবে, সেটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানান আলোচকেরা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল গঙ্গার শাখা নদীগুলো নিয়ে। প্রকল্পের লক্ষ্য হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়ালসহ বিভিন্ন নদীতে পানি সরবরাহ বাড়ানো। কিন্তু পরিবেশবিদদের প্রশ্ন, বর্ষায় গঙ্গায় পর্যাপ্ত পানি থাকার পরও বর্তমানে এসব শাখা নদীতে স্বাভাবিকভাবে সেই পানি প্রবেশ করছে না কেন এবং এর মূল কারণ সমাধান না করে ব্যারাজ নির্মাণ কতটা কার্যকর হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, ব্যারাজ নির্মাণের ফলে শুধু পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো নয়, ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে, তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগগুলোর মধ্যে রয়েছে পলি ব্যবস্থাপনা। ব্যারাজের উজানে পানি আটকে রাখলে পলি জমা, নদীর তলদেশ উঁচু হওয়া, বন্যা এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি কীভাবে পরিবর্তিত হবে—এ নিয়ে আরও হালনাগাদ বিশ্লেষণের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদেরা। প্রকল্পের সমালোচকেরা এ ক্ষেত্রে ফারাক্কা ব্যারাজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন। তবে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় পলি জমার প্রভাব সীমিত থাকবে বলে যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, সেটি নিয়ে তাঁদের আপত্তি রয়েছে।
পাংশার উজানের এলাকায় প্রকল্প থেকে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও অন্যান্য খাতে যে অর্থনৈতিক সুবিধার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেই হিসাব কতটা নির্ভরযোগ্য—সেটিও ১০ প্রশ্নের একটি। প্রকল্পের পক্ষে থাকা পরিকল্পনায় কৃষি উৎপাদন, নদীর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সুফলের কথা বলা হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, এসব সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্যও সমানভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়টিও সামনে আসে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বর্তমান গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ সরকার নতুন চুক্তিতে আরও বেশি পানির অংশ চাইবে বলে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন। এমন সময়ে ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন আলোচকেরা।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি আপত্তি প্রকল্পে ব্যবহৃত তথ্যের বয়স নিয়ে। গঙ্গা ব্যারাজের পরিকল্পনা কয়েক দশকের পুরোনো এবং বিভিন্ন সময়ে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। বাপা ও বেনের আলোচকেরা বলছেন, নদীর প্রবাহ, পলি, জলবায়ু, ভূমির ব্যবহার ও পরিবেশগত বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে; তাই পুরোনো তথ্যের ওপর নির্ভর না করে হালনাগাদ তথ্য দিয়ে নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
সবশেষে প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের বিপুল ব্যয় নিয়ে। প্রথম পর্যায়েই ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এর আর্থিক লাভ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা আরও স্বচ্ছভাবে যাচাই করা উচিত বলে মত দিয়েছেন আলোচকেরা।
তবে এসব প্রশ্ন প্রকল্পটি যে ব্যর্থ হবে—এমন প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়। সরকারি প্রকল্প নথিতে ব্যারাজের উদ্দেশ্য হিসেবে শুষ্ক মৌসুমের পানিসংকট মোকাবিলা, নদী পুনরুজ্জীবন, সেচ সম্প্রসারণ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নতির কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে বাপা ও বেনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এসব সম্ভাব্য সুবিধার পাশাপাশি পলি, বন্যা, ভাটির প্রবাহ, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ ও আন্তদেশীয় পানি বণ্টনের ঝুঁকিগুলোও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশ্যে যাচাই করা প্রয়োজন।


