দুবাইয়ে গ্রেপ্তার পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সরকারের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ। প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইউএই কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে। এখন তাদের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে। তিনি জানান, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বেনজীর আহমেদ দেশটির ফেডারেল পুলিশের হেফাজতেই রয়েছেন।
সীমান্তে পুশ-ইন নিয়ে সরকারের অবস্থান
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কথিত ‘পুশ-ইন’ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং কাউকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, কোনো বাংলাদেশি নাগরিক ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান করলে প্রচলিত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাই শেষে তাকে দেশে ফেরানো যেতে পারে। তবে জাতীয়তা নিশ্চিত না করে কাউকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়।
ভারত যদি বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা সরবরাহ করে, তাহলে সরকার আইনগত প্রক্রিয়ায় পরিচয় যাচাই করে তাদের গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি। যথাযথ যাচাই ছাড়া কাউকে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা দুই দেশের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শরিফ ওসমানকে ফেরাতে উদ্যোগ
ভারতে গ্রেপ্তার ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ প্রয়োজনীয় নথি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে সরকার আশাবাদী।
মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত আইনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের আধুনিক অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যাতে তারা সশস্ত্র মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করতে পারেন।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন বিপুলসংখ্যক মাদক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধানও রাখা হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর মাদক ব্যবসা রোধে নতুন ব্যবস্থা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল লেনদেন ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে মাদক ব্যবসা ও অর্থ পাচারের প্রবণতা বেড়েছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনকে আরও যুগোপযোগী করা হবে।
তিনি জানান, মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস শনাক্ত, অবৈধ সম্পদ জব্দ, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ, প্রতিটি জেলায় আধুনিক মাদক পরীক্ষাগার স্থাপন, ডগ স্কোয়াড গঠন এবং সিআইডির ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য শুধু মাদক উদ্ধার বা গ্রেপ্তার নয়, বরং একটি মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকাসক্তদের অপরাধী নয়, রোগী হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
অভিযান ও মামলা
অনুষ্ঠানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে ৩০ হাজার ৭৪৪টি মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৯ হাজার ২৯১টি মামলা দায়ের এবং ৯ হাজার ৬৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাশাপাশি মানি লন্ডারিং আইনে ৯টি মামলার মাধ্যমে প্রায় ২২ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ২১ শিক্ষার্থী, তিন কর্মকর্তা ও তিনটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। আলোচনা সভার আগে মাদকবিরোধী শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং সচেতনতামূলক ভিডিও ও থিম সং প্রদর্শন করা হয়।



