নৌ ও বিমান বাহিনীর কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে কোনোভাবেই বিবেচনায় না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা, যোগ্যতা, নেতৃত্বের গুণাবলি, শৃঙ্খলা, সততা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
রোববার বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে ‘নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
এবারের পদোন্নতি পর্ষদে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন, কমান্ডার ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এবং বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন, উইং কমান্ডার ও স্কোয়াড্রন লিডার পদমর্যাদার যোগ্য কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
নির্বাচনী পর্ষদের কার্যক্রম শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিসবাহ উল আজীমকে অ্যাডমিরাল র্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেন। পরে তাঁকে নতুন দায়িত্বের জন্য অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধনী বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের এবং বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে হতাহতদের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ নৌ ও বিমান বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শুধু দেশের প্রতিরক্ষা নয়, অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বিভিন্ন দুর্যোগের সময় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার ক্ষেত্রেও এই দুই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
এ কারণে দেশের প্রয়োজনে নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের ত্যাগ ও অবদানের জন্য দুই বাহিনীর প্রধানসহ সব সদস্যকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
তবে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কর্মকর্তাদের পদোন্নতির নীতিমালা নিয়ে তাঁর নির্দেশনা। নির্বাচনী পর্ষদের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে থাকতে হবে।
এর পরিবর্তে একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে কতটা দক্ষ, তাঁর নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা কেমন, তিনি কতটা শৃঙ্খলাপরায়ণ, সৎ ও বিশ্বস্ত—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য একজন কর্মকর্তা কতটা উপযুক্ত, সেটিই বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নৌ ও বিমান বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। দেশের প্রয়োজনের সময় বাহিনীর সদস্যরা যে দায়িত্ব পালন করছেন, তার জন্য তাঁদের প্রতি সরকারের কৃতজ্ঞতা রয়েছে।
‘নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন অপারেশনাল স্থাপনা পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, প্রতিরক্ষা সচিবসহ সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সব মিলিয়ে, এবারের নির্বাচনী পর্ষদে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি বিষয়—পদোন্নতি যেন কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে। বরং একজন কর্মকর্তার দক্ষতা, সততা, নেতৃত্ব এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ভিত্তিতেই তাঁর ভবিষ্যৎ পদায়ন ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সশস্ত্র বাহিনীর মতো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



