রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে তিনটি সাপের বাচ্চা পিটিয়ে হত্যার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপগুলোকে হত্যা না করে সহজেই উদ্ধারকারী সংগঠনের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যেত। শুধু তাই নয়, বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী সাপগুলো যদি পাতি নেকড়ে সাপ হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো হত্যা করা বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।

ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৮ তলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বারান্দায়। সেখানে তিনটি সাপের বাচ্চাকে দেয়াল বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। কিছু সময় পর সাপগুলোকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়।

ঘটনার ভিডিও দেখে সাপ–গবেষক আবু সাইদের ধারণা, সাপগুলো পাতি নেকড়ে সাপ হতে পারে। এই প্রজাতির সাপ নির্বিষ। এগুলো খাড়া দেয়াল, পাইপ কিংবা তার বেয়ে ওপরে উঠতে সক্ষম।

তবে সচিবালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় সাপগুলোকে উদ্ধারের চেষ্টা না করে মেরে ফেলার ঘটনায় সমালোচনা করেছেন বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ঢাকায় বর্তমানে একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাপ উদ্ধারে কাজ করে। তাদের খবর দিলে সাপগুলোকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব ছিল।

বন অধিদপ্তর জানিয়েছে, সচিবালয়ে সাপের বাচ্চা পাওয়ার বিষয়ে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তারা ঘটনাটি জানতে পারে।

বন অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তার মতে, মানুষের অসচেতনতার কারণে এমনিতেই দেশে বন্য প্রাণী রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর মধ্যে সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলে বন্য প্রাণী রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং সরকার গঠিত ওয়াইল্ডলাইফ কমিশনের সদস্য রেজা খান মনে করেন, কোথাও সাপ দেখা গেলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত সেটিকে পর্যবেক্ষণ করা এবং পরে সঠিক ব্যক্তি বা উদ্ধারকারী সংগঠনকে খবর দেওয়া।

তাঁর মতে, সাপ কিংবা অন্য কোনো বন্য প্রাণী দেখামাত্র সেটিকে হত্যা করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে সচিবালয়ের মতো জায়গায় যদি বন্য প্রাণী সম্পর্কে ন্যূনতম সচেতনতার ঘাটতি দেখা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছেও নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে আইন।

দেশে বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য ‘বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬’ রয়েছে। এই আইনে তফসিলভুক্ত বন্য প্রাণী শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনের ভাষায় শিকারের মধ্যে বন্য প্রাণী ধরা, আহত করা কিংবা হত্যা করার মতো কাজও অন্তর্ভুক্ত।

বিভিন্ন প্রজাতির সাপ এই আইনের তফসিলে রয়েছে। বিশেষজ্ঞের ধারণা অনুযায়ী সচিবালয়ে পাওয়া সাপগুলো যদি পাতি নেকড়ে সাপ হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাতি নেকড়ে সাপ আইনের তফসিল-২-এ অন্তর্ভুক্ত।

এই প্রজাতির সাপের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একই অপরাধ আবার করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

তবে সচিবালয়ের ১৮ তলার বারান্দায় সাপগুলো কীভাবে পৌঁছাল, তার নিশ্চিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারীর মতে, কিছু প্রজাতির সাপ গাছ কিংবা ভবনের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করে ওপরে উঠতে পারে। ভবনের পাশে কোনো গাছ থাকলে সেটি ব্যবহার করেও সাপ ভবনে প্রবেশ করতে পারে।

সাপ উদ্ধার ও এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করা ‘ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ ফাউন্ডেশন’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা অনন্যা ফারিয়াও ঘটনাটিকে হতাশাজনক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশেও কিছু বন্য প্রাণী এখনো টিকে আছে, যার মধ্যে সাপ অন্যতম।

বর্তমানে দেশে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সাপ উদ্ধারে কাজ করছে। ফলে খবর দেওয়া হলে উদ্ধারকারীরা সচিবালয়ে গিয়ে সাপগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারতেন।

ঘটনার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাঁরা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সব মিলিয়ে সচিবালয়ে তিনটি সাপের বাচ্চা হত্যার ঘটনাটি শুধু বন্য প্রাণীর প্রতি মানুষের আচরণ নিয়েই নয়, আইনের প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাপ দেখামাত্র হত্যা না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে উদ্ধারকারী ব্যক্তি বা সংগঠনকে খবর দেওয়াই উচিত। কারণ নির্বিষ একটি সাপকে আতঙ্কের কারণে হত্যা করা যেমন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি তফসিলভুক্ত বন্য প্রাণী হলে সেটি হত্যার ঘটনায় আইনি শাস্তির মুখেও পড়তে হতে পারে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version