জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ধাক্কা এবার সরাসরি পড়ল গণপরিবহনের ভাড়ায়। দূরপাল্লার বাস এবং ঢাকা-চট্টগ্রামসহ মহানগর এলাকায় চলাচলকারী বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং মহানগর এলাকায় ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল। তবে সেই প্রস্তাব পুরোপুরি গ্রহণ না করে উভয় ক্ষেত্রেই কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা করে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়লেও বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন ভাড়ার হার কার্যকর করতে প্রজ্ঞাপন জারির কথাও জানিয়েছে সরকার।
সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে। একই সঙ্গে কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি জ্বালানির দামই লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাসভাড়া সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সাধারণত বাসভাড়া নির্ধারণে জ্বালানির পাশাপাশি যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে এবার অন্যান্য ব্যয় নতুন করে যুক্ত না করে মূলত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনা করেই ভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর পর বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তখন ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা করা হয়। একই সময়ে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়েছিল।
নতুন সিদ্ধান্তে কিলোমিটারপ্রতি আরও ১৭ পয়সা যোগ হলে যাত্রার দূরত্ব যত বাড়বে, যাত্রীর অতিরিক্ত ব্যয়ও তত বাড়বে। সহজ হিসাবে ১০ কিলোমিটার যাত্রায় বাড়তি দিতে হবে ১ টাকা ৭০ পয়সা। ২০ কিলোমিটারে ৩ টাকা ৪০ পয়সা এবং ৩০ কিলোমিটারে বাড়বে ৫ টাকা ১০ পয়সা।
একই হিসাবে ৫০ কিলোমিটার পথ গেলে আগের তুলনায় ৮ টাকা ৫০ পয়সা বেশি দিতে হবে। ৭৫ কিলোমিটারে বাড়বে ১২ টাকা ৭৫ পয়সা। আর ১০০ কিলোমিটারের যাত্রায় শুধু নতুন সমন্বয়ের কারণে ভাড়া বাড়বে ১৭ টাকা।
দূরপাল্লার যাত্রীদের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক আরও বড় হবে। ১৫০ কিলোমিটার যাত্রায় বাড়তি ভাড়া হবে ২৫ টাকা ৫০ পয়সা। ২০০ কিলোমিটারে ৩৪ টাকা, ২৫০ কিলোমিটারে ৪২ টাকা ৫০ পয়সা এবং ৩০০ কিলোমিটার দূরত্বে আগের নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে আরও ৫১ টাকা যোগ হবে।
অর্থাৎ কোনো দূরপাল্লার রুটের নির্ধারিত দূরত্ব ২০০ কিলোমিটার হলে শুধু কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বৃদ্ধির হিসাবে একজন যাত্রীকে আগের তুলনায় ৩৪ টাকা বেশি দিতে হবে। একইভাবে ৩০০ কিলোমিটারের যাত্রায় বাড়তি গুনতে হবে ৫১ টাকা।
তবে যাত্রীর চূড়ান্ত ভাড়া শুধু এই হিসাবের ওপর নির্ভর করবে না। দূরপাল্লার অনেক নন-এসি বাসে ৫২টির পরিবর্তে ৪০ বা তার কম আসন রাখা হয় এবং এসব বাসে ভাড়ার কাঠামো আলাদা হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রুটে সেতু ও সড়কের টোল থাকলে সেটিও ভাড়ার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার মূলত নন-এসি বাস ও নগর পরিবহনের বাস-মিনিবাসের ভাড়া নির্ধারণ করে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বা এসি বাস এবং পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া সরকার সরাসরি নির্ধারণ করে না। ফলে এসব পরিবহনের ভাড়া একই হারে বাড়বে—এমন নয়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ সামনে এসেছে। এখন সরকার নির্ধারিত নতুন হার কার্যকর হলে কোন রুটে ঠিক কত টাকা ভাড়া হবে, তা দূরত্ব, বাসের ধরন এবং প্রযোজ্য টোলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। ফলে যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সরকার ঘোষিত নতুন ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী ভাড়া আদায় হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা।


