মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩, ১০ রবিউস সানি ১৪৪৮

দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে একসঙ্গে ২০ টাকা বাড়ানোর পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে মূল্যস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছে। এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানিতেই এক ধাপে ২০ টাকা করে বেড়েছে।

বাংলাদেশে একবারে জ্বালানি তেলের বড় মূল্যবৃদ্ধির নজির রয়েছে ২০২২ সালের আগস্টেও। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে সে সময় জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ৩৪ থেকে ৪৬ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। এরপর পরিবহন থেকে কৃষি ও শিল্প—বিভিন্ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়। তবে পরবর্তী মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে দায়ী করা ঠিক হবে না; বৈশ্বিক পণ্যমূল্য, বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় এবং দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিসহ একাধিক বিষয় মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রেখেছে।

এবারের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরকার মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ও বিমা ব্যয় বেড়ে যাওয়া, আমদানি খরচ এবং বিপিসির ভর্তুকির চাপের কথা বলছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানিতে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পুরোপুরি অনুসরণ করলে ডিজেলের দাম লিটারে প্রায় ২০৫ টাকা হওয়ার কথা ছিল; ভর্তুকি দিয়ে তা ১৩৫ টাকায় রাখা হয়েছে।

সরকারের আরেকটি যুক্তি জ্বালানি পাচারের ঝুঁকি। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের দামের পার্থক্য পাচারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সরকারের দেওয়া হিসাবে কলকাতায় ডিজেলের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা এবং পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সার সমপরিমাণ। তবে দেশভেদে কর, ভর্তুকি, মুদ্রার বিনিময় হার ও মানুষের আয় আলাদা হওয়ায় শুধু খুচরা মূল্য দিয়ে সরাসরি তুলনা করার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এদিকে বিপিসির আর্থিক অবস্থাও বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। বিপিসির প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে সংস্থাটি প্রায় ৫৫ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা লভ্যাংশ, কর ও অন্যান্য খাতে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান সংকটে বিপিসির লোকসান ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। ফলে অতীতের মুনাফা কতটা বর্তমান ভর্তুকি সামলাতে ব্যবহার করা সম্ভব এবং মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প কী ছিল—এ প্রশ্নও আলোচনায় এসেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত পড়ে পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়। ডিজেলের দাম বাড়লে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য পণ্যবাহী যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য, খাদ্য, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে নেওয়ার খরচও বাড়তে পারে। সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের কতটা ভোক্তার ওপর পড়ে, সেটিই মূল্যস্ফীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এই পরিস্থিতি আরও আলোচনায় এসেছে নতুন জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকরের সময়। সরকার ২০২৬ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ গ্রেডে ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করেছে। গ্রেডভেদে প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ। তবে পুরো বৃদ্ধি একবারে কার্যকর হচ্ছে না; ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অর্থ বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে নতুন বেতন স্কেলের মূল বেতন বাস্তবায়নে ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে। তবে চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য আগেই ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে। ফলে অর্থের কোনো বরাদ্দই রাখা হয়নি—এমনটি নয়; বরং রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের ওপর নতুন বেতন কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি চাপ কতটা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এখানেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে ঘিরে বিতর্কটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। একদিকে দীর্ঘ ১১ বছর পর সরকারি কর্মীদের বেতন সমন্বয়ের পক্ষে জীবনযাত্রার ব্যয় ও দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির যুক্তি রয়েছে। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে প্রায় সব পরিবারের ব্যয়ে পড়তে পারে। তাই একটি সিদ্ধান্তকে অন্যটির সরাসরি কারণ হিসেবে না দেখে বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও আয়বৈষম্যের সামগ্রিক প্রভাব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের ওপর চাপের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বয় না করে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ভাড়া ও বাজারে যেন অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি না ঘটে, সে জন্য নজরদারি বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে সরকার।

তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে পরিবহন ভাড়া, খাদ্যপণ্য, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কতটা পরিবর্তিত হয় তার ওপর। তাই সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একদিকে বিপিসির আর্থিক চাপ ও জ্বালানি সরবরাহ সামলানো, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও দ্রুত বাড়িয়ে না দেয়, সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখা।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version