রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩, ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৮

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন অস্থিরতা। মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্যের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই আন্দোলনে রয়েছেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রেখে তাঁরা আগের উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছেন। এমনকি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে খোলাচিঠিও দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

ঘটনার সূত্রপাত বুঝতে ফিরে যেতে হয় গত বছরের কুয়েটের পরিস্থিতিতে। শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলন চলে। সেই পরিস্থিতিতে গত বছরের ২৫ এপ্রিল কুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য ড. মুহাম্মদ মাছুদ এবং সহ-উপাচার্য ড. শেখ শরীফুল আলমকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এরপর চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হযরত আলীকে কুয়েটের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে মাসখানেকের মধ্যেই তিনিও সেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান।
এর মধ্যেই কুয়েটের সাবেক সহ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে সম্প্রতি চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ একই পদে চলতি বছরের ২৭ জুলাই চুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চার বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে উপাচার্যের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

ঠিক কী কারণে অধ্যাপক সায়েমকে এত অল্প সময়ের মধ্যে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, সেটিই এখন শিক্ষার্থীদের বড় প্রশ্ন। তাঁর অব্যাহতির কারণ স্পষ্ট না হওয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, অধ্যাপক সায়েমকে আবার চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব দিতে হবে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৩-এর ১০(১) ধারা অনুযায়ী, আচার্য প্রকৌশল শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশল শিক্ষাবিদকে চার বছরের মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। একই আইনের ১০(২) ধারায় আচার্যকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই উপাচার্যকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। এই বিধানের আওতাতেই অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব থেকে সরানোর সুযোগ রয়েছে।

আইন অনুযায়ী উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা না থাকা নিয়ে। চার বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া একজন উপাচার্যকে দুই মাসও পূর্ণ হওয়ার আগে কেন সরিয়ে দেওয়া হলো, সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো কারণ সামনে না আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন উপাচার্যকে ঘিরে আগের ঘটনাপ্রবাহ। অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম এর আগে কুয়েটের সহ-উপাচার্য ছিলেন। সেখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিরোধ ও আন্দোলনের মধ্যে তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই শিক্ষককেই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় সিদ্ধান্তটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন আন্দোলনকারীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। চুয়েটে অনেক জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ অধ্যাপক থাকার পরও কেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে উপাচার্য হিসেবে আনা হলো, সেই প্রশ্নও তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজ প্রতিষ্ঠানের যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জন করেছিলেন বলে আন্দোলনকারীদের ভাষ্য। এ কারণেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ তাঁর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাঁকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাঁরা ক্লাস ও পরীক্ষাও বর্জন করছেন।
চলমান পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলছে। বারবার প্রশাসনিক নেতৃত্বে পরিবর্তন হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা কার্যক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং একাডেমিক ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপনের একটি শর্ত নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে উপাচার্যকে সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থান করার কথা বলা হয়েছে। অথচ শিক্ষার্থীদের বিরোধিতার মধ্যে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ভার্চ্যুয়ালি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে তথ্য সামনে এসেছে।

ফলে পরিস্থিতি এখন শুধু একজন উপাচার্যকে সরিয়ে অন্যজনকে নিয়োগ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন উপাচার্যকে শিক্ষার্থীরা কতটা গ্রহণ করছেন এবং চলমান অচলাবস্থা কীভাবে নিরসন হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুরো ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগব্যবস্থা নিয়েও বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। আইন অনুযায়ী নিয়োগ ও অব্যাহতির ক্ষমতা থাকলেও কোনো উপাচার্যকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দিয়ে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কারণ প্রকাশ না করে সরিয়ে দেওয়া হলে সেই সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এখন চুয়েটের শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহাল করা। অন্যদিকে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে ইতিমধ্যে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে দ্রুত সমাধান না এলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম। তাই চুয়েটের চলমান সংকট নিরসনে নিয়োগের কারণ ও সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া নিয়ে পরিষ্কার অবস্থান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version