৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশে। বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষে শুরু হওয়া এই ভোট গ্রহণ চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এবারের নির্বাচনে ভোটার ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমদ। তবে অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় তিনি নিজে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। অন্যদিকে সংসদ সদস্য হওয়ায় মির্জা ফখরুল নিজেই ভোট দিয়েছেন।
দুপুরে ভোট শুরুর আগে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ৩৫ বছর পর সাংবিধানিক নিয়মে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে। এবার সরকারি ও বিরোধী—দুই পক্ষ থেকেই প্রার্থী থাকায় নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায়, দীর্ঘ সময় অনেক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হয়েছে। এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে নির্বাচন হওয়াকে তিনি গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর আশা, এর মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের নতুনভাবে সূচনা হবে এবং জনগণ প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক চর্চা দেখতে পাবে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ পরিচালনা করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি এই নির্বাচনে নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভোট শুরুর আগে সংসদকক্ষে তিনি রাষ্ট্রপতি পদে দুই প্রার্থী এবং তাঁদের প্রস্তাবক ও সমর্থকের নাম ঘোষণা করেন। এরপর সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার নিয়ম বুঝিয়ে দেন।
নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা ব্যালট পেপারে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করেন এবং এরপর ব্যালট বাক্সে ভোট দেন। বিকেল ৫টায় ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর ভোট গণনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ভোট গ্রহণের শুরুতে প্রথমে ভোট দেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল ভোট দেন। তাঁরা ভোট দেওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ কয়েকজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দেন। প্রধানমন্ত্রী ভোট দেওয়ার পরও এক ঘণ্টার বেশি সময় সংসদকক্ষে নিজের আসনে বসে ভোট গ্রহণের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
এ সময় তাঁর পাশে ছিলেন রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। প্রধানমন্ত্রী নিজের আসনে বসে থাকা অবস্থায় তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সংসদ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের খোঁজখবর নেন।
বিকেল ৩টা ১৩ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সংসদকক্ষ ছেড়ে নিজের কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে যাওয়ার সময় তিনি বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও সঙ্গে নেন।
এর আগে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও ভোট দেন। ভোট দেওয়ার পর তিনি বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। সরকারদলীয় অনেক সংসদ সদস্যও ভোট দেওয়ার পর মির্জা ফখরুল ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের সঙ্গে হাত মেলান।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ এই নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন না। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে যে ঐকমত্য হয়েছিল, সেখান থেকে সরে আসার কারণে তারা এই নির্বাচন বর্জন করছে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতি পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো।
এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে সংখ্যার হিসাবে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এগিয়ে রয়েছেন। সংসদে বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন, আর ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষের প্রার্থী অলি আহমদ সংসদ সদস্য নন। ফলে সংখ্যাগত বাস্তবতায় মির্জা ফখরুলের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। তবে দুই প্রার্থী থাকায় নিয়ম অনুযায়ী ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়েছে।
নির্বাচন শেষে নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন চিফ হুইপ। ফলে ভোট গণনা ও ফল ঘোষণার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এবারের ভোট শুধু একজন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়, দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটের মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর দায়িত্ব পালন এবং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তাঁর ভূমিকা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


