রবিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮

দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব আবারও মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছে সরকার। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম তদারক ও সমন্বয় করবেন। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—জেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ক্ষমতার সীমারেখা আসলে কোথায় থাকবে?

গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দেশের ৬৪ জেলার দায়িত্ব ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের তিনজন হুইপের মধ্যে ভাগ করে দেয়। কাউকে একটি, আবার কাউকে দুই থেকে তিনটি জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এবারের প্রজ্ঞাপনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সরাসরি নির্বাহী ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার আইনি ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখেই তাঁরা তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সংশ্লিষ্ট জেলার সরকারি দপ্তরগুলোকে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার নিয়ন্ত্রণ, চোরাচালান প্রতিরোধ এবং গুরুতর অপরাধ দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন।

পাশাপাশি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমও তাঁরা তদারক করবেন। প্রয়োজন হলে জেলার বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগও থাকবে।

কিন্তু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এই তদারকি ও সমন্বয়ের সীমা নিয়ে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বাস্তবে শুধু তদারকির মধ্যেই থাকবেন, নাকি স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের প্রভাব তৈরি হবে—সেটি নিয়ে আলোচনা চলছে।

বিশেষ করে যেসব জেলায় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য নেই, সেখানে বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের সিদ্ধান্তটির আইনি ভিত্তি হিসেবেও সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট বিধানের কথা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী অথবা তাঁর কর্তৃত্বে প্রয়োগ করা হয়।

তবে এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশে নতুন নয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার একবার মন্ত্রীদের জেলার দায়িত্ব দিয়েছিল। পরে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ২০০৩ সালে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও পিরোজপুরের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। ২০০৬ সালে হাইকোর্ট ওই সময়কার ব্যবস্থাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন।

তখন মামলার শুনানিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কর্তৃত্বের সংঘাত তৈরি হতে পারে কি না। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে স্থানীয় প্রশাসনের স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও সামনে এসেছিল।

এবার সরকার অবশ্য দায়িত্বের কাঠামোয় পরিবর্তন এনেছে। মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিজেদের জেলার দায়িত্ব না দিয়ে কাছাকাছি অন্য এক বা একাধিক জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম পেয়েছেন মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার দায়িত্ব। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সম্ভাব্য বিভেদ নিয়ে তিনি বলেছেন, প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন করবেন এবং কেউ কারও ওপর কর্তৃত্ব করবেন না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মূলত তদারকি ও সমন্বয়ের কাজ করবেন। সব দলের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়েই কাজ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

তবে রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিরোধী দল-অধ্যুষিত জেলাগুলোকে কেন্দ্র করে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল অনুযায়ী কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা—এই আট জেলার কোনো আসনেই বিএনপি জয় পায়নি। আট জেলায় মোট সংসদীয় আসন ৩০টি।

এর মধ্যে ছয় জেলার সব আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা জয়ী হয়েছেন। কুড়িগ্রাম ও রংপুরে জামায়াতের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির একজন করে সংসদ সদস্য রয়েছেন এবং বাকি আসনগুলো জামায়াতের।

এমন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব জেলায় বিএনপির মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের দায়িত্ব দেওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয় কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের দায়িত্ব পেয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে দেওয়া হয়েছে লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নীলফামারীর দায়িত্ব। চুয়াডাঙ্গার দায়িত্ব পেয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।

অন্যদিকে সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের দায়িত্ব পেয়েছেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী পেয়েছেন বগুড়া ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম পেয়েছেন রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের দায়িত্ব।

সরকারের নতুন উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তাঁর আশঙ্কা, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা জেলার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে স্থানীয় মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, অতীতেও এমন ব্যবস্থার সুফল পাওয়া যায়নি; বরং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ফলে সরকারের নতুন ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন দায়িত্বের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে। কাগজে-কলমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দায়িত্ব তদারকি ও সমন্বয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হলেও মাঠপর্যায়ে সেই সীমারেখা কতটা বজায় থাকবে, সেটিই দেখার বিষয়।

একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হবে এবং বিরোধী দল-অধ্যুষিত জেলাগুলোতে এই ব্যবস্থা নতুন কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে কি না—সেদিকেও থাকবে নজর।

সম্পাদক ও প্রকাশক: শিহাব আহমেদ

Sokal News | সকাল নিউজ is a youth-led online news and media portal dedicated to delivering accurate, timely, and impactful news. Driven by a passion for truth and transparency, our mission is “সত্যের আলোয় প্রতিদিন” (“In the light of truth, every day”). Stay connected with us for trustworthy news coverage from a fresh perspective.

প্রধান কার্যালয়:
সকাল নিউজ, ই-১৭/৬, চায়না টাউন, ভিআইপি রোড, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

© 2026 সকাল নিউজ. সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত Shihab Group.
Exit mobile version